বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিল একসময় ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এই বিলে পাওয়া যেত কৈ, মলা, ঢেলা, বেলে, পাবদা, সরপুঁটি, বৌ, মেনি, টেংরা, পুঁটি, গুচি, বাতাসি, খলিশা, চান্দা ও চিংড়ির মতো নানা প্রজাতির ছোট মাছ। পাশাপাশি গজার, বাইম, বোয়াল, গুজা, ফলই ও শোলের মতো বড় মাছও ছিল প্রচুর। মাছের সঙ্গে সঙ্গে এই জলাভূমি ছিল মাছরাঙা, পানকৌড়ি, টোগা, সাদা বক, শামুকখোল, ডাহুক, গাঙচিল, চাকলা, ঘুঘু, রাতচোরা, কানা বকসহ নানা দেশি ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। ষাট ও সত্তরের দশকে চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় এক হাজার ২৫ বর্গকিলোমিটার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত সড়ক, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ ও বসতি গড়ে ওঠার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে পুকুর খননের প্রবণতা শুরু হয়। এর ফলে শুধু আবাদি জমি কমে যাচ্ছে না, শত শত সেতু ও কালভার্টের স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথও বন্ধ হয়ে পড়ছে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা অনেক এলাকায় একাধিক ফসল ফলাতে পারছেন না, কোথাও আবার জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। গত দুই দশকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া; পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া; নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় তিন ফসলি জমিতে অসংখ্য পুকুর খনন করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, এই অনিয়ন্ত্রিত পুকুর খননের ফলে চলনবিলের প্রাচীন মানচিত্র ইতোমধ্যে অনেকটাই বদলে গেছে। আটটি উপজেলার বিস্তৃত এলাকায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার পুকুর খনন হয়েছে, আর প্রতিবছর নতুন করে আরও প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০টি পুকুর তৈরি হচ্ছে। এর ফলে গত ২০ বছরে চলনবিল অঞ্চলের প্রায় আট হাজার হেক্টর আবাদি জমি হারিয়ে গেছে।বিশেষ করে যেসব সচ্ছল কৃষকের এক জায়গায় বহু বিঘা জমি রয়েছে, তারা পুকুর খনন করে তা লিজ দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জন করছেন। কিন্তু এতে কৃষিজমি কমে যাওয়া, দেশীয় মাছের উৎপাদন হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, পাখির খাদ্য ও বিচরণস্থল সংকুচিত হওয়া কিংবা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার বিষয়গুলোকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।বর্তমানে প্রশাসনের নানা উদ্যোগ ও অভিযানের পরও তাড়াশ, উল্লাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পুকুর খনন অব্যাহত রয়েছে। একসময় চলনবিলকে ঘিরে থাকা হুড়াসাগর, করতোয়া, গুমানি, ফুলজোর, চিকনাই, সরস্বতী, ভদ্রাবতীসহ অসংখ্য নদী ও খাল এই অঞ্চলের পানিপ্রবাহ ও নৌযোগাযোগ সচল রাখত। এখন সেই জলপথের বড় অংশ পুকুরে রূপান্তরিত হওয়ায় জলাবদ্ধতা বেড়েছে, খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর ও জলপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও।আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রে কোনো অনুমতি ছাড়াই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর খনন করা হচ্ছে। পুকুর খননের পরও ফসলি জমির হারে ভূমি কর পরিশোধ করা হচ্ছে, যা স্পষ্টভাবে আইন লঙ্ঘনের শামিল।পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও কঠোরভাবে এই অনিয়ন্ত্রিত পুকুর খনন বন্ধ করা না গেলে চলনবিল তার স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক পরিচয় হারাতে বসবে। তাই দেশের বৃহত্তম এই বিল রক্ষায় অবিলম্বে পুকুর খননের লাগাম টানা প্রয়োজন। সচেতন মানুষের প্রত্যাশা—চলনবিল রক্ষায় সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক এবং প্রাকৃতিক এই সম্পদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকুক।
