ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক বর্তমানে এক গভীর টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অভিবাসন নীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এই উত্তেজনার সর্বশেষ সংযোজন হলো ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরোপিত বড় অঙ্কের জরিমানা। এর ফলে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপকে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করায় প্রশ্ন উঠছে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে পশ্চিমা ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা কি ভেঙে পড়ার পথে? এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপ ও আমেরিকার সম্পর্ক এক নতুন ও অনিশ্চিত অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ নিয়ে সম্প্রতি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সকে প্রায় ১৪ কোটি ডলার জরিমানা করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে, বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখেছে এবং গবেষকদের তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তই মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ দ্বন্দ্বে নতুন করে উত্তাপ ছড়ায়। তবে বাস্তবে ট্রাম্প প্রশাসন অনেক আগেই ইউরোপের সঙ্গে সংঘাতমূলক অবস্থানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে ইউরোপকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাতারে দাঁড় করানো হয়েছে। ট্রাম্প নিজেও ইউরোপীয় দেশগুলোর কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ইউরোপ নিজেদের নীতির মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুর্বল করে তুলছে। এ অবস্থায় ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উত্তেজনার বিস্তৃত প্রেক্ষাপট ইইউর জরিমানার জবাবে ইলন মাস্ক অভিযোগ করেন, ইউরোপ আমলাতান্ত্রিক শাসনের আড়ালে বাকস্বাধীনতা দমন করছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইইউ বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়ে একটি হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেন, যা ইউরোপের কট্টর ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি কটাক্ষ করে বলেন, মাস্ক চাইলে মঙ্গল গ্রহে চলে যেতে পারেন—সেখানে কোনো সেন্সরশিপ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এই জরিমানা শুধু একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো মার্কিন প্রযুক্তি খাত ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর আঘাত। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি ইউরোপের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত, এ সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপ সেন্সরশিপ চাপিয়ে দিতে চাইছে। সিনেটর টেড ক্রুজ ইইউর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান—যা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র তার শত্রু রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে করে থাকে। বৃহত্তর রাজনৈতিক চিত্র ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা অর্থনীতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করছে এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল করছে। বিশেষ করে অভিবাসন নীতি এই সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইউরোপের শাসকগোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত শিথিল করে সমাজের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে এবং সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করছে। ইলন মাস্ক ও জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে ইউরোপের কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি
সমর্থনজানিয়েছেন, যার মধ্যে জার্মানির এএফডি উল্লেখযোগ্য। ট্রাম্পের নীতিপত্রে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপের তথাকথিত ‘সভ্যতা বিনাশ’ ঠেকাতে ইইউ সদস্য দেশগুলোর ভেতরে প্রতিরোধ গড়ে তোলাও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য। ইউরোপের অবস্থান ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু ইউরোপের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাবেক ইইউ পররাষ্ট্রনীতি প্রধান জোসেপ বোরেল আরও কঠোর ভাষায় একে ইইউর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যুদ্ধের ঘোষণা বলে অভিহিত করেন। তার মতে, ট্রাম্প একটি বিভক্ত ও নিয়ন্ত্রিত ইউরোপ দেখতে চান। ন্যাটো ও রাশিয়ার প্রেক্ষাপট ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে সব ইউরোপীয় দেশ ন্যাটোর নির্ভরযোগ্য অংশীদার নাও থাকতে পারে। ন্যাটোর অনির্দিষ্ট সম্প্রসারণ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনায় রাশিয়া সন্তুষ্ট। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন,যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সব মিলিয়ে এসব ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের বড় ধরনের ফাটল নির্দেশ করে। ইউরোপের জন্য সময়টি আরও কঠিন, কারণ ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের নেতারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করছেন এই আশঙ্কায় যে, ট্রাম্প ইউরোপকে উপেক্ষা করে যুদ্ধ নিয়ে আলাদা সমঝোতায় যেতে পারেন। হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যে ইউরোপের অবস্থানকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছে, যা ইউরোপকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে এক ধরনের কোণঠাসা অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে।
ইউরোপকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন: বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণ
