মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার খবর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এসব হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য খুব বেশি প্রকাশ করা হয়নি, তবুও বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই সংঘাত ধীরে ধীরে বড় আকারের সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।
এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন কিংবা তেল আবিব কেউই সরাসরি স্থল অভিযান শুরু করার ঘোষণা দেয়নি। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন সূত্র বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে এবং সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহলে আলোচনাও চলছে। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার চলমান সামরিক কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার কৌশল নিয়ে ভাবছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের আকাশসীমায় সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে শুধু বিমান হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার পরিবর্তে প্রয়োজনে স্থল অভিযানের প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রয়োজন হলে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন স্থল অভিযান শুরু করা যায়, সে ধরনের পরিকল্পনাও সামরিক পর্যায়ে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে মার্কিন স্থল অভিযান শুরু করার ক্ষেত্রে সাধারণত দুই ধরনের কৌশল সামনে আসতে পারে। প্রথমটি হলো প্রচলিত বড় আকারের সামরিক অভিযান। এই পদ্ধতিতে মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো সামরিক ঘাঁটিতে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। অনেক সময় এমন অভিযানের জন্য কয়েক লাখ সেনা প্রয়োজন হয়। তবে এত বড় সংখ্যক বাহিনী অল্প সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করা এবং মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা বাস্তবসম্মত হবে—তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় সম্ভাব্য পদ্ধতি হলো সীমিত আকারের বিশেষ অভিযান। এতে বিশেষ প্রশিক্ষিত সামরিক ইউনিট বা বিশেষ বাহিনীকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানার পরিকল্পনা করা হতে পারে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এ ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি এই পরিকল্পনাগুলোকে জটিল করে তুলছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এসব ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার খবরও পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এসব হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে সীমিত আকারের বিশেষ বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকেও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বক্তব্যে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি স্থল অভিযান শুরু করা এখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পরিকল্পনা নয়। তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বিভিন্ন কৌশলগত বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে আরও একটি সম্ভাব্য কৌশলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানের ভেতরে বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠী বা বিরোধী শক্তিকে ব্যবহার করে সরকারকে চাপের মুখে ফেলার পরিকল্পনাও আলোচনায় থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তা বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে—এমন ধারণাও কিছু বিশ্লেষক তুলে ধরছেন।
তবে বাস্তবে কোন কৌশল গ্রহণ করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ভবিষ্যতে ইরানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে, তা জানতে এখনো বিশ্ববাসীকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।