যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেলান্ড ট্রাম্প কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই ইরান-এর সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ইতি টানেন, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এতে তেহরান কৌশলগতভাবে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে এবং উপসাগরীয় আরব তেল-গ্যাস উৎপাদক দেশগুলো এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যার জন্য তারা প্রস্তুত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার পরিবর্তে এই সংঘাত বরং তাদের আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা মোকাবিলা করে টিকে থাকলে তেহরান আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী—যা বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ—সেটি বন্ধ বা ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত এই যুদ্ধ শেষ করতে পারে, এমনকি কোনো চুক্তি ছাড়াই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া যুদ্ধের সমাপ্তি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দুবাইভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক Mohammad Baharoon বলেন, “বাস্তব কোনো ফলাফল ছাড়া যুদ্ধবিরতিই মূল সমস্যা।” তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ করলেও ইরান একইভাবে থামবে—এমন নিশ্চয়তা নেই, বিশেষ করে যতদিন এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় থাকবে।
তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌচলাচলের স্বাধীনতা ব্যাহত হলে তা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ইরানের জ্বালানি প্রবাহ ব্যাহত করার সক্ষমতা ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য হামলাকারীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বহুবার ভাবতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর নজিরবিহীন হামলার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় ধরনের ভুল মূল্যায়ন করেছে। সংঘাতের শুরুতেই সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেয়ি নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন দিকে নিয়ে যায়।
তার স্থলাভিষিক্ত হন মোজতাবা খামেনী শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে চালানো এই হামলা উল্টো ইরানের ভেতরে প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের মনোভাব আরও জোরদার করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, এই সংঘাত রাজনৈতিক সীমা ছাড়িয়ে ধর্মীয় ও সভ্যতার সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যার ফলে খামেনি একজন বিতর্কিত শাসক থেকে প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জটিল রাষ্ট্র কাঠামো—যেখানে বহুস্তরীয় প্রতিষ্ঠান ও সমান্তরাল ক্ষমতার কাঠামো রয়েছে—তা বিবেচনায় না নেওয়াই ছিল বড় ভুল। ফলে প্রত্যাশিত পতনের বদলে দেশটি আরও শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
এছাড়া পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অসম যুদ্ধ কৌশলকেও সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। তেহরানের লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ জেতা নয়, বরং ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করা—বিশেষ করে জ্বালানি সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে কেন্দ্র করে।
সব মিলিয়ে, কোনো সুস্পষ্ট ও কার্যকর সমাধান ছাড়া এই সংঘাতের ইতি টানা হলে তা ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।