মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরানের আশপাশে হঠাৎ করেই আকাশজুড়ে দেখা গেছে ঘন কালো ধোঁয়ার বিশাল মেঘ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ডিপো ও তেল শোধনাগারে হামলার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৭ মার্চ রাতে ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের কয়েকটি জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে তেল আবিব। হামলার পর ওই সব স্থাপনা থেকে আগুন ও ঘন কালো ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত তা তেহরানের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে যেতে থাকে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দিয়েছে। তার মতে, জ্বালানি ডিপোর মতো স্থাপনায় হামলা শুধু সামরিক উত্তেজনাই বাড়ায় না, বরং এর ফলে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত ও দূষিত পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, এ ধরনের হামলা পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে বেসামরিক মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ক্ষতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ভিন্ন দাবি করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব জ্বালানি ডিপো ও স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলো ইরানের সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি সাংবাদিকদের জানান, এসব স্থাপনা থেকে ইরানের বিভিন্ন যুদ্ধযন্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য জ্বালানি সরবরাহ করা হতো। তার ভাষায়, এসব স্থাপনা সামরিক কার্যক্রমের অংশ হওয়ায় সেগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
হামলার পর সৃষ্ট আগুন থেকে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও রাসায়নিক কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধোঁয়ার মধ্যে হাইড্রোকার্বন, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকতে পারে। এসব গ্যাস ও কণা মানুষের শ্বাসতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
প্রায় ৯০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস তেহরান শহরে। হামলার পর ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া শহরের বড় অংশ ঢেকে ফেলেছে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতির কারণে অনেক মানুষ আতঙ্কে শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে শুরু করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে নাগরিকদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। বাসিন্দাদের যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ, হৃদরোগী, ফুসফুসের রোগী এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বাইরে না যাওয়ার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের ডিপোতে আগুন লাগলে যে ধরনের দূষিত কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তা দীর্ঘ সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে থাকতে পারে। এসব কণা পানির বাষ্পের সঙ্গে মিশে গেলে অম্লীয় বৃষ্টিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। ফলে দূষিত বৃষ্টি আবার মাটিতে নেমে এসে মাটি, পানি ও কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের আবহাওয়া বিভাগও এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের মতে, বাতাসের প্রবাহের কারণে দূষিত কণাগুলো সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের দূষিত ধোঁয়া মানুষের শরীরে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে শ্বাসনালীতে জ্বালা, কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখে জ্বালা এবং মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যারা অ্যাজমা বা ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে।
এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে এই দূষিত বাতাসে অবস্থান করলে ফুসফুসের ক্ষতি, ত্বকে রাসায়নিক পোড়া বা অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্যসমস্যাও দেখা দিতে পারে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এ ধরনের হামলা শুধু সামরিক সংঘাতকেই তীব্র করে না, বরং এর প্রভাব পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীরভাবে পড়ে।