মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এবার দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। ইরানে ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে লাতিন আমেরিকাতেও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানানো হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইকুয়েডরের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ও মাদকভিত্তিক অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। যৌথ অভিযানের ঘোষণা
মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় সামরিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানায়, ৩ মার্চ থেকে ইকুয়েডরের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযান চলছে। সংস্থাটির প্রধান জেনারেল ফ্রান্সিস ডোনোভান বলেন, এ পদক্ষেপ লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক-সন্ত্রাসবাদ দমনে অংশীদার দেশগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
বিবৃতির সঙ্গে সামরিক হেলিকপ্টার উড্ডয়ন এবং আকাশ থেকে ধারণ করা নজরদারি চিত্র প্রকাশ করা হয়। সেখানে মাটিতে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তিকে হেলিকপ্টারে তোলা হচ্ছে—এমন দৃশ্য দেখা যায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রভাবশালী মাদক কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। কয়েকটি শক্তিশালী কার্টেলকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেন, যৌথভাবে মাদক-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা ও দুর্নীতির মাধ্যমে অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, মাদক পাচার একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ—এটি যুদ্ধ নয়। ফলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং মানবাধিকার প্রশ্নও উঠতে পারে।
সামুদ্রিক অভিযানে হতাহতের অভিযোগ
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযান লক্ষ্য করে বহু আকাশ হামলা চালানো হয়েছে। এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
কিছু ঘটনায় জীবিত উদ্ধার ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে নিহতদের পরিচয় ও তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রকাশ করা হয়নি—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
অন্যদিকে কলম্বিয়া ও ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর কিছু পরিবার দাবি করেছে, নিহতদের অনেকে জেলে বা সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন, মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। ভেনেজুয়েলায় অভিযানের বিতর্ক
ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডেও সম্প্রতি দুটি সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রথম অভিযানে একটি জেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র ব্যবহার করত বলে অভিযোগ।
দ্বিতীয় অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অস্ত্র-সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়।
এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলতে পারে।
ইকুয়েডরে অপরাধ পরিস্থিতি ও নতুন কৌশল
২০২০ সালে মহামারি শুরুর পর ইকুয়েডরে হত্যা ও সহিংস অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুব বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে কৌশলগত অবস্থান—যা বড় কোকেন উৎপাদক দেশ কলম্বিয়া ও পেরুর মাঝামাঝি—অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
একসময় তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত ইকুয়েডর এখন শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি মাদক পাচার ও অবৈধ খনন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ‘নতুন ধাপ’ শুরু করার কথা জানিয়েছেন এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সমালোচকদের উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পরিধি বাড়তে থাকায় উদ্বেগও বাড়ছে। কিছু নীতি বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন—যৌথ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তাদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সামরিক শক্তি প্রয়োগ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক আইনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।