উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আরব মিত্ররা ধীরে ধীরে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে সরাসরি জড়িত হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে তাদের অর্থনীতিতে আঘাত এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা—এই কঠোর অবস্থানের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা আরও জোরদার হয়েছে, বিশেষ করে বিমান হামলার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে ইরানের অর্থনীতির ওপরও নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। যদিও এখনো এসব দেশ প্রকাশ্যে নিজেদের সেনা মোতায়েন করেনি, তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সৌদি আরব সম্প্রতি তাদের পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ‘কিং ফাহদ বিমানঘাঁটি’ যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে রিয়াদ জানিয়েছিল, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে নিজেদের স্থাপনা বা আকাশপথ ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু ইরানের পাল্টা হামলায় সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো ও রাজধানী লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় তাদের সেই অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন নতুন কৌশল গ্রহণের পথে হাঁটছেন এবং সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন। একাধিক সূত্র বলছে, সৌদি আরবের যুদ্ধে প্রবেশ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানও সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের হামলার ব্যাপারে তাদের ধৈর্যের সীমা রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো দুর্বল—এমন ধারণা ভুল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে ইরানি সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। তারা কিছু ইরানি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সম্পদ জব্দ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এর ফলে ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ আরও সংকুচিত হতে পারে।
দুবাইয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইরানি প্রতিষ্ঠান যেমন হাসপাতাল ও ক্লাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এগুলো আর কার্যকর নেই এবং আইন লঙ্ঘনের কারণে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইউএই ইরানি ব্যবসা ও বিনিয়োগের একটি বড় কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যা ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে আরব দেশগুলো যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার কথা বলছে, তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র ও যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, কিছু হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেই সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। জাহাজ চলাচলে বাধা এবং নির্দিষ্ট জাহাজকে ছাড় দেওয়ার মতো কৌশল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এমনকি প্রণালিতে শুল্ক আরোপের কথাও আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের হামলা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, বিলাসবহুল স্থাপনা—সবই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতই হাজার হাজার হামলা প্রতিহত করেছে বলে দাবি করেছে।
এ অবস্থায় আরব দেশগুলোর নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। তাদের দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে দুর্বল না করা পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যে যথেষ্ট নয়, তা সাম্প্রতিক হামলাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে। কাতারসহ অন্যান্য দেশ এসব হামলাকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে।
আরব বিশ্বে এখন এক ধরনের হতাশাও কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতা ও বিপুল বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও তারা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে তেমন প্রভাব ফেলতে পারছে না।
বর্তমান সংঘাতের পেছনে পাল্টাপাল্টি হামলার একটি চক্রও কাজ করছে। ইসরায়েলের আগের হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তারা এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে তাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, শক্তিশালী মিত্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার ফলে অনেক সময় দুর্বল রাষ্ট্রগুলো এমন সংঘাতে আটকে পড়ে, যেটিতে তারা শুরু থেকেই জড়াতে চায় না—বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।