মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইস্যুতে ‘কিছুটা ইতিবাচক খবর’ এসেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শেষ করতে শান্তি আলোচনার বিষয়ে আশাবাদ তৈরি করছে।
তবে তিনি জানিয়েছেন, বুধবারের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো নাও হতে পারে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইরান হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেয়। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পৃথক একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এই ঘোষণা আসে।
তবে পরবর্তীতে উভয় পক্ষের বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
শুক্রবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ‘ভালো খবর’ কী, তা বিস্তারিতভাবে জানাননি।
সপ্তাহের শেষে সরাসরি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা
‘মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে অগ্রগতি ভালোভাবে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে,’ অ্যারিজোনার ফিনিক্স থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সপ্তাহের শেষে আলোচনা করছি। আমি আশা করি বিষয়গুলো ভালোভাবে এগোবে। অনেক কিছুই আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছেছে।’
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা চলবে না। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে দেওয়া যাবে না, এবং এটি সবকিছুর ওপরে।’
তবে এর বিপরীত অবস্থানও তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, বুধবারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বাতিল করা হতে পারে। পাশাপাশি তিনি জানান, ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
ট্রাম্প রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই সপ্তাহের শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও সরাসরি আলোচনা হতে পারে। তবে কিছু কূটনীতিকের মতে, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বৈঠক আয়োজনের লজিস্টিক জটিলতার কারণে তা অনিশ্চিত।
শনিবার ভোর পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজধানীতে কোনো বৈঠকের প্রস্তুতিরও লক্ষণ পাওয়া যায়নি। গত সপ্তাহের শেষে একই স্থানে অনুষ্ঠিত সর্বোচ্চ পর্যায়ের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
এদিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বুধবার থেকে তেহরানে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মধ্যস্থতার সঙ্গে যুক্ত একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বৈঠক হলে প্রাথমিকভাবে একটি সমঝোতা স্মারক হতে পারে, এরপর ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি সম্ভব।
তবে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে কিছু বক্তব্য। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালি ‘খোলা থাকবে না’।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, যুদ্ধবিরতির ১০ দিনের সময়সীমা পর্যন্ত প্রণালি সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খোলা থাকবে।
জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রায় ২০টি জাহাজ—যার মধ্যে কনটেইনার জাহাজ, বাল্ক ক্যারিয়ার ও তেলবাহী ট্যাঙ্কার ছিল—উপসাগর হয়ে হরমুজ প্রণালির দিকে এগোতে দেখা যায়। তবে পরে অধিকাংশ জাহাজই ফিরে যায়, যদিও এর কারণ স্পষ্ট নয়। এই দলে ফরাসি শিপিং কোম্পানি সিএমএ সিজিএম-এর তিনটি কনটেইনার জাহাজও ছিল, তবে কোম্পানিটি কোনো মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে দুবাইয়ে আটকে থাকা একটি প্রমোদতরী ‘সেলেস্টিয়াল ডিসকভারি’ শনিবার সকালে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ওমানের দিকে গেছে বলে মেরিন ট্রাফিকের তথ্য জানিয়েছে।
ইরান বলেছে, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে, যা যুদ্ধের আগে বাধ্যতামূলক ছিল না। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘শত্রু শক্তি’—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত জাহাজ ও সামরিক নৌযানগুলো এখনো প্রণালি পার হতে পারবে না।
শিপিং কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলের আগে মাইন ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী নাবিকদের সতর্ক করে বলেছে, জলপথের কিছু অংশে মাইন ঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা যায়নি, তাই ওই এলাকা এড়িয়ে চলা উচিত।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা, আলোচনায় বড় মতপার্থক্য
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমাধানে পৌঁছাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শান্তি আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
ইরান দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং এ অধিকার তাদের রয়েছে।
ট্রাম্প রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নেবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ওই উপাদান অন্য কোথাও স্থানান্তর করা হবে না।
অন্যদিকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করছে তেহরান।
এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ অবস্থা থেকে মুক্ত করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, তবে এর সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি।
তবে একই দিনে অ্যারিজোনার এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই কোনো টাকা লেনদেন হবে না।’ তিনি বারবার এই চুক্তিকে ‘চুক্তি’ বা ‘লেনদেন’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
গত সপ্তাহের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত করার প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে ইরান তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য কার্যক্রম বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ইরানের দুইটি সূত্র বলছে, আপসের কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা আংশিকভাবে ইউরেনিয়ামের মজুদ হ্রাসের পথ খুলে দিতে পারে।
ট্রাম্প রয়টার্সকে আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পদক্ষেপ নাও নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে ধীরে ধীরে এগোবো, বড় যন্ত্রপাতি দিয়ে খনন করব এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসব।’
তবে ট্রাম্পের আশাবাদের বিপরীতে ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। একই সঙ্গে শুক্রবার জুমার নামাজে দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় নেতারা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
ধর্মীয় নেতা আহমাদ খাতামি বলেন, ‘আমাদের জনগণ অপমানিত অবস্থায় কোনো আলোচনা করে না।’