যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতার প্রভাব এখন ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারেও অনুভূত হতে শুরু করেছে। ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অনেক ব্যাংক নিজেদের মধ্যে ডলার লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি দাম নির্ধারণ করছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিক পর্যন্ত টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার প্রায় স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু মার্চ মাসে প্রবেশ করার পর ধীরে ধীরে ডলারের মূল্য বাড়তে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণেই ব্যাংকগুলো সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছে।
এই পরিস্থিতি অনেকের কাছে ২০২২–২৩ সালের সময়কার ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তখন রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় তুলনামূলকভাবে কমে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি কিছু দিক থেকে ভিন্ন। এখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে এবং বাজারে ডলারের সরবরাহও মোটামুটি স্বাভাবিক। তবুও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাংকগুলো ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিবেচনায় সতর্কতা অবলম্বন করছে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান জানিয়েছেন, অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে অনেক ব্যাংক এখন বাজারের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছে। তার মতে, এই সংঘাতের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২২ টাকা ৬৯ পয়সা, যা আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেশি। কয়েক দিন আগেও এই হার ছিল ১২২ টাকা ৪৯ পয়সা ও তার আগে প্রায় ১২২ টাকা ৪৩ পয়সা।
চট্টগ্রামভিত্তিক একটি আমদানিনির্ভর শিল্পগোষ্ঠীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাস্তবে এখনও বড় ধরনের ডলার সংকট তৈরি হয়নি। তবে কিছু ব্যাংক ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে উচ্চমূল্যে ডলার নির্ধারণ করছে বলে তিনি মনে করেন।
তার ভাষ্যমতে, আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খোলার সময় কিছু ব্যাংক প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা পর্যন্ত দর চাইছে। আবার ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট তারিখে ডলার সরবরাহের চুক্তি বা ফরওয়ার্ড সেলের ক্ষেত্রে ডলারের মূল্য আরও বেশি ধরা হচ্ছে।
ফরওয়ার্ড ডলার সেল এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ তারিখে নির্ধারিত দামে ডলার বিক্রি করার চুক্তি করা হয়। তখন বাজারে ডলারের প্রকৃত মূল্য যাই হোক না কেন, চুক্তি অনুযায়ী সেই দামে লেনদেন সম্পন্ন হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক সম্প্রতি ডলার বিক্রির দর নির্ধারণ করেছে প্রায় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা এবং কেনার দর ১২১ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে ১২১ টাকা ৮০ পয়সার মধ্যে রেখেছে।
বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক ডলার বিক্রির জন্য প্রায় ১২২ টাকা ৯৫ পয়সা এবং কেনার জন্য প্রায় ১২১ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে।
ঢাকা ব্যাংক বিলস ফর কালেকশনের ক্ষেত্রে ডলার বিক্রির দর প্রায় ১২২ টাকা ৯৯ পয়সা এবং কেনার দর প্রায় ১২১ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করেছে।
অন্যদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে প্রায় ১২২ টাকা ৯০ পয়সায় এবং কিনেছে প্রায় ১২১ টাকা ৬০ পয়সায়।
মতিউল হাসান আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে ডলারের প্রবাহ স্বাভাবিক থাকায় অনেক ব্যাংক আগে অর্থ পরিশোধ নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিল না। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন ব্যাংকগুলো ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। তার মতে, সব ব্যাংকের কাছে সমানভাবে ডলার আসে না, তাই কিছু ব্যাংক সামান্য বেশি দর নির্ধারণ করতে পারে।
তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, এখনো পরিস্থিতি খুব বেশি অস্থির হয়ে ওঠেনি। কিন্তু যদি যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না। অর্থাৎ টাকার মান ধরে রাখতে তারা নিয়মিতভাবে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করছে না। ফলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই টাকার মান কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত বাজার থেকে নতুন করে ডলার কেনাও বন্ধ রেখেছে বলে জানা গেছে।
চলতি অর্থবছরের ২ মার্চ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করেছে, যার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পদ্ধতিতে হিসাব করলে এই রিজার্ভ প্রায় ২৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানির বিল পরিশোধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করেছিল।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে জ্বালানি আমদানির জন্য রিজার্ভ থেকে ডলার সহায়তা দেওয়া হতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদরা এই বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে কেবল রিজার্ভের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা খোঁজা উচিত।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাসরুর রিয়াজ বলেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এক মাসের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যেতে পারে।
তার মতে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জ্বালানির দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, সম্ভাব্য এই ব্যয়ের চাপের কারণেই বাজারে ডলারের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ অবস্থায় তিনি বিদ্যমান জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশের কত জ্বালানি প্রয়োজন হবে এবং তার সম্ভাব্য ব্যয় কত হতে পারে—তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
এই পরিকল্পনার ভিত্তিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া যেতে পারে এবং সেই অর্থ জ্বালানি আমদানিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে বর্তমানে স্থগিত থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত চালু করার মাধ্যমে বিদেশি অর্থায়নের প্রবাহ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।