যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত সব ক্যাথলিক চ্যাপলিনদের প্রধান নেতা ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “ন্যায় যুদ্ধ তত্ত্বের আলোকে—এটি সেই মানদণ্ড পূরণ করে না।”
ক্যাথলিক আর্চডায়োসিস ফর দ্য মিলিটারি সার্ভিসেস ইউএসএ’র প্রধান আর্চবিশপ টিমোথি ব্রগলিও সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান “পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে একটি হুমকি ছিল”, তবে সেই ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা মানে হচ্ছে “হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তার প্রতিক্রিয়া দেখানো”। সাক্ষাৎকারটি রোববার প্রচারের জন্য ধারণ করা হয়েছে।
ন্যায়যুদ্ধ তত্ত্ব একটি দার্শনিক ও আইনি কাঠামো, যার শিকড় অগাস্টিন অব হিপ্পো এবং থমাস অ্যাকিউনাস-এর ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তায় নিহিত। এই তত্ত্বের উদ্দেশ্য হলো নির্ধারণ করা—কখন যুদ্ধ শুরু করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং কীভাবে সেই যুদ্ধ পরিচালিত হওয়া উচিত।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যুদ্ধ হতে হবে সর্বশেষ উপায়; এটি কেবল গুরুতর অন্যায় সংশোধনের জন্য গ্রহণযোগ্য। পাশাপাশি এতে বৈধ কর্তৃত্ব, সঠিক উদ্দেশ্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ থাকা আবশ্যক।
ব্রগলিও সিবিএসকে বলেন, “প্রভু যিশু অবশ্যই শান্তির বার্তা দিয়েছেন, এবং আমার মতে যুদ্ধ সবসময়ই সর্বশেষ উপায় হওয়া উচিত। আমি এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করছি না, কারণ সব তথ্য আমার জানা নেই। তবে আমার কাছে মনে হয়, এই যুদ্ধকে এমন কিছু হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন—যা ঈশ্বরের সমর্থন পেতে পারে।”
ব্রগলিওর এই মন্তব্য ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে—যাদের অনেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরানের সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের ইতিহাস, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন—এসবই সামরিক পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দেয়।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা এই যুদ্ধকে ট্রাম্পের “পছন্দের যুদ্ধ” (ওয়ার অব চয়েজ) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে তিনি আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন এড়িয়ে গেছেন।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন জনমতেও এর প্রভাব পড়ছে। ইউগভ ও দ্য ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক জরিপে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অনুমোদন হার ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
সিবিএসের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানের জন্য আগাম ধারণ করা এক সাক্ষাৎকারে ব্রগলিওকে জিজ্ঞাসা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্য সম্পর্কে তার মতামত কী। হেগসেথ আমেরিকানদের “প্রতিদিন হাঁটু গেড়ে” যিশু খ্রিস্টের নামে সামরিক বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে ব্রগলিও বলেন, “এটি কিছুটা সমস্যাজনক মনে হয়,” কারণ যিশু শান্তির কথা বলেছেন এবং যুদ্ধকে সর্বশেষ উপায় হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
তবে তিনি নিজের অবস্থান কিছুটা নমনীয় করে যোগ করেন, “তাদের কাছে এমন তথ্য থাকতে পারে, যা তাদেরকে মনে করিয়েছে—এটাই ছিল একমাত্র পথ।”
ব্রগলিও আরও জানান, ইতিহাসের প্রথম মার্কিন জন্মসূত্রের ক্যাথলিক পোপ চতুর্দশ লিও’র অবস্থানের সঙ্গে তিনি নিজেকে একাত্ম মনে করেন, “যিনি যুদ্ধের অবসানে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।”
পোপ লিও ইতোমধ্যেই ট্রাম্পসহ অন্যান্য বিশ্বনেতাদের মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ (“অফ-র্যাম্প”) খুঁজতে আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার এক প্রার্থনাসভায় দেওয়া বক্তব্যে পোপ বলেন, খ্রিস্টীয় মিশন অনেক সময় “আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষায় বিকৃত হয়েছে, যা যিশু খ্রিস্টের পথের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।”
ব্রগলিও বলেন, তিনি ক্যাথলিক সেনাসদস্যদের পরামর্শ দেন “যতটা সম্ভব কম ক্ষতি করতে এবং নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করতে।” তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে বিবেকগত আপত্তির কাঠামো এমন যে, “আপনি কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ বা নির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারবেন না; আপনি কেবল বলতে পারবেন—‘আমি যুদ্ধের বিরোধী।’”
তিনি আরও বলেন, “প্রশ্ন হতে পারে, জেনারেল বা অ্যাডমিরালদের কি এমন কোনো সুযোগ আছে—যেখানে তারা বলতে পারেন, ‘আমরা কি বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখতে পারি?’”
শেষে তিনি যোগ করেন, “তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, তারাও একই ধরনের দ্বিধার মধ্যে রয়েছেন।”