ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনেক প্রার্থীর বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর মতে, প্রার্থী যাচাইয়ে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত নমনীয়তা,রাজ-
নৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণু আচরণ এবং সহিংসতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এবারের নির্বাচনও বিতর্কের মুখে পড়তে পারে। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে তিনি মত দেন।শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সাতটি বিভাগ ও বিভিন্ন জেলায় নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী এবং সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে সুজন। এসব আলোচনায় উঠে আসা চিত্র মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। নির্বাচনী পরিবেশে রাজনৈতিক সহনশীলতার স্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে অনিচ্ছুক, যা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁর স্মৃতিতে রয়েছে—একজন কমিশনার এক প্রার্থীর বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘মনোনয়ন বৈধ করে দিলাম, ব্যাংকের টাকা দিয়ে দিয়েন।’ এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঋণখেলাপি ছিলেন। এরপরও সহানুভূতির কারণে তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি এই মুহূর্তে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করে এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তাহলে আসন্ন নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া অনিবার্য। এ ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং সরকার—সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে জনগণের প্রত্যাশিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন।
সংবাদ সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অপপ্রচারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ভোটের দিন কোনো প্রার্থী মারা গেছেন বা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন—এমন ভুয়া তথ্য এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে ভোটা-
রদের বিভ্রান্ত করা হতে পারে। এতে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে বিশেষ সতর্কতা ও তৎপরতা দেখানোরআহ্বান জানান তিনি। পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাও বিতর্কের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনিয়ম হলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ফলাফল নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই এ বিষয়েস্বচ্ছ তদন্ত ও স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ জরুরি।সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। এইসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যদি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে, তাহলে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রার্থীকে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা জনমনে সন্দেহ ও অনাস্থা সৃষ্টি করেছে। লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, প্রার্থীদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের বিবরণসংবলিত হলফনামা পর্যালোচনা করে অনেক নাগরিকের ধারণা—একাধিক প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন কমিশন কি সংশ্লিষ্ট সহযোগী সংস্থার সহায়তায় এসব তথ্য যথাযথ+
ভাবে যাচাই করেছে? প্রভাবশালী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কমিশন কি নমনীয় আচরণ করেছে? এসব অভিযোগের আংশিক সত্যতাও থাকলে নির্বাচন মারাত্মকভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। যেকোনো উপায়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ জানান দিলীপ কুমার সরকার। তিনি বলেন, সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন বাধ্যতা-
মূলক হওয়ায় এক দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়ে মনোনয়ন নেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন দলীয় সাধারণ সদস্যদের গোপন ভোটে প্রার্থী বাছাইয়ের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু আরপিওতে তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। যদিও বিদ্যমান আইনে প্যানেল পদ্ধতির সুযোগ রয়েছে, বাস্তবে কোনো দলই তা অনুসরণ করেনি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। নির্বাচনী ব্যয় পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়া ঠেকাতে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সুজনের মতে, ঋণখেলাপিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান না নিলে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংবাদ সম্মেলনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার বিষয়টি উঠে আসে। দিলীপ কুমার সরকার জানান, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে নারী মনোনয়ন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশে। এটি দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করা হয়।