এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন করেছে। জোটের পরে নাহিদ ইসলাম বলেছেন,এটি কোনো আদর্শিক জোট নয়, কেবল নির্বাচনী কৌশল। এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। কেন তা ঠিক নয়, তা নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো। ১. কৌশল কি আদর্শশূন্য হতে পারে?রাজনীতিতে কৌশল কখনোই আদর্শশূন্য হতে পারে না। কারণ কৌশল মানে কোনো লক্ষ্য অর্জনের পথ। আর লক্ষ্য মানে কিছু নীতি, মূল্যবোধ বা রাজনৈতিক অবস্থান। যদি বলা হয়, ‘কৌশল মাত্র’, তাহলে প্রশ্ন আসে– এনসিপির আদর্শ কি এবং তারা কোন লক্ষ্য অর্জন করতে চায়? রাজনৈতিক জোট শুধু আসন ভাগাভাগি নয়। জোট মানে জনসমক্ষে একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া, সমাজ, ইতিহাস, ন্যায় ও ক্ষমতার প্রশ্নে অবস্থান স্পষ্ট করা। কার সঙ্গে জোট হবে, কার সঙ্গে হবে না– এভাবে দল তার নৈতিক সীমারেখা নির্ধারণ করে। তাই ‘কৌশল মাত্র’ বলা হলো দায় এড়ানোর ভাষা, যদি নীতি স্পষ্ট না করা হয়। ২. জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল ভাবনা: নির্বাচন নয়, রাষ্ট্র গঠন
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সাধারণ ক্ষমতা বদলের ঘটনা নয়। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল নির্বাচন দাবিতে নয়, বরং একটি ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা ভেঙে নতুন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। মানুষের ত্যাগের মূল কারণ ছিল– রাষ্ট্র কার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি, এবং রাষ্ট্রশক্তির উৎস কোথায়।
নির্বাচন এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য নয়। নির্বাচন তখন অর্থবহ, যখন রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে ন্যূনতম ন্যায় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এনসিপি এই মৌলিক বিষয়টি কখনও স্পষ্ট করেনি। ৩. হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থা এবং এনসিপির দায় ৫ আগস্টের
গণঅভ্যুত্থান সম্পন্ন না করে, ৮ আগস্ট সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা ব্যক্তি হিসেবে ক্ষমতায় নেই, কিন্তু সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা অব্যাহত আছে। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যক্তির নাম নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক। নির্বাচনের মাধ্যমে পুরোনো ব্যবস্থা বৈধতা পেলেই ফ্যাসিবাদ পুনরায় শক্তি পায়। ৪. ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার দ্বৈত বিভাজন জুলাই গণঅভ্যুত্থান ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার বিভাজন ভাঙার সুযোগ এনেছিল। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল ইনসাফ, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ের দাবিতে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে জোট বেঁধে এনসিপি সেই পুরোনো দ্বৈত বিভাজন আবার রাজনীতির কেন্দ্র করে দিয়েছে। ফলে ইনসাফ-
কেন্দ্রিক ঐক্য দুর্বল হয়েছে।৫. বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং জামায়াত। এনসিপি ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে কথা বলে– এটি ন্যায্য। কিন্তু ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিল। আজও প্রশ্ন হলো, তারা কি সত্যিই সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে? যদি না হয়, তাহলে নাম বহাল রেখে জোটে থাকা অর্থাৎ অতীতের দায় এড়িয়ে রাজনীতি করা। ৬. ইসলাম, জুলুম ও ইনসাফ
ইসলামকে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে হাজির করা এক জিনিস, আর পাকিস্তান রক্ষার নামে ইসলামকে জালিম রাজনীতিতে ব্যবহার করা আলাদা। একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা জালিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়েছিল; জামায়াতে ইসলামী পুরোনো নাম বহাল রেখে সেই জালিম ইসলামের স্মৃতি বহন করছে।৭. নাম পরিবর্তনের প্রশ্নে এনসিপির নীরবতা জুলাই গণঅভ্যুত্থান জামায়াতের জন্য নাম পরিবর্তন ও অতীতের দায় স্বীকারের সুযোগ এনেছিল। কিন্তু এনসিপি কি এই শর্ত তুলেছে? যদি না, ‘কৌশলগত জোট’ কথার নৈতিক ভিত্তি নেই। ৮. জামায়াত থাকলে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন জামায়াত যদি পুরোনো নাম ও ইতিহাস বহাল রাখে, তাহলে বাঙালি জাতীয়তাবাদও বৈধতা পায়। আওয়ামী লীগ নিজেকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। অর্থাৎ এই জোট কার্যত আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে শক্তিশালী করছে, যা রাজনৈতিকভাবে ভুল। ৯. নির্বাচনবাদ ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতাএনসিপি নির্বাচনী রাজনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে সব প্রশ্ন ভোট, আসন ও অর্থনৈতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে জনগণ নৈতিক আহ্বানে সাড়া দেয়; কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে নয়।১০. মন্ত্রণালয় অভিজ্ঞতা ও তরুণ নেতৃত্বএনসিপির তিনজন নেতা মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা গণমুখী সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান উদাহরণ রাখতে পারেনি। এর ফলে তরুণ রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।১১. শিবির ও জামায়াত এক নয়
শিবির একটি তরুণ সংগঠন, জামায়াত ইতিহাস বহন করে। গণঅভ্যুত্থানের পর শিবিরের তরুণদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে এনসিপি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, অথচ পরে জামায়াতের সঙ্গেজোটকরেছে১২.বিশ্বাসবনামধর্মনিরপেক্ষতা
বাংলাদেশে ধর্মকে বিশ্বাস এবং মতাদর্শ এক করে দেখা হয়। বিশ্বাস মানুষের নৈতিক জীবন ও সিদ্ধান্তের ভিত্তি। কিন্তু ধর্মকে একটি মতাদর্শ হিসেবে প্যাকেজ করলে তা ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে যায়।১৩. পদত্যাগ নয়, জবাবদিহি রাজনীতিজোটের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করা নেতাদের ক্ষোভ বোঝা যায়, কিন্তু ফলপ্রসূ নয়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি প্রয়োজন ছিল গাঠনিক লড়াই, দলের ভিতরে প্রশ্ন তোলা এবং নেতৃত্বকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা।১৪. গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া নির্বাচন সহিংসতা ডেকে আনেযদি রাষ্ট্র নিরাপত্তা ও বিচার নিশ্চিত করতে না পারে, নির্বাচন সহিংসতার উৎসব হয়ে ওঠে। গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া নির্বাচন মানে আরও অস্থিরতা।
১৫. ইতিহাস আবেগ নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিচার করেগণঅভ্যুত্থান জনগণের নৈতিক আহ্বান দেখিয়েছে। নির্বাচন কেবল কৌশল, রাষ্ট্রগঠন নীতি। এনসিপি এই দুটি আলাদা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর রাজনৈতিক মূল্য তাদের পরিশোধ করতে হবে।
ফরহাদ মজহার