কানাডার তেলসমৃদ্ধ পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টায় দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আবেগ তীব্র হয়ে উঠছে। আগামী ১৯ অক্টোবর প্রদেশটির নাগরিকরা ভোট দিয়ে নির্ধারণ করবেন তারা কানাডার অংশ হিসেবেই থাকতে চান, নাকি স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি চূড়ান্ত আইনগত গণভোট আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করতে চান। এই ভোট শুধু আলবার্টার ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো কানাডার জাতীয় ঐক্যের জন্য গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ২১ মে টেলিভিশন ভাষণে আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে অবিভক্ত কানাডার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন বলে জানান। স্বাধীনতার দাবিতে তিন লাখের বেশি মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদন জমা পড়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভোটারদের সামনে সরাসরি ‘থাকবেন নাকি আলাদা হবেন’ ধরনের প্রশ্ন রাখা হচ্ছে না। বরং জানতে চাওয়া হবে—আলবার্টা কি কানাডার একটি প্রদেশ হিসেবেই থাকবে, নাকি সরকার সংবিধান অনুযায়ী এমন একটি চূড়ান্ত প্রাদেশিক গণভোট আয়োজনের আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করবে, যেখানে আলবার্টা কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে কি না তা নির্ধারণ করা হবে। প্রিমিয়ারের দপ্তর জানিয়েছে, মূলত দুটি পথ থাকবে—কানাডার অংশ হিসেবে থাকা অথবা স্বাধীনতার জন্য আনুষ্ঠানিক গণভোটের পথে যাওয়া।
এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভ। স্বাধীনতাপন্থিদের অভিযোগ, কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার আলবার্টার বিপুল তেলসম্পদ থেকে সুবিধা নিলেও প্রদেশটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। বিশেষ করে পরিবেশনীতি ও জ্বালানি পরিবহন প্রকল্পসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে আলবার্টার জ্বালানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাদের দাবি। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ প্রদেশটির স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর প্রতি অবহেলার অনুভূতিও এই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের সামনের সারিতে রয়েছেন বনিভিল এলাকার অস্ত্র ব্যবসায়ী মিচ সিলভেস্টার ও ক্যালগেরির আইনজীবী জেফরি রাথ। তারা ‘আলবার্টা সমৃদ্ধি প্রকল্প’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় শাসনের কারণে আলবার্টার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কেউ কেউ স্বাধীনতার দাবিকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে আরও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের কৌশল হিসেবে দেখলেও অনেকে সত্যিকারের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি কিছু সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
জেফরি রাথ দাবি করেছেন, আলবার্টার সংস্কৃতি ও মানসিকতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঞ্চলের বেশি মিল রয়েছে। তিনি আরও জানান, তারা ওয়াশিংটনে গিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে কথাও বলেছেন, যাতে স্বাধীন রাষ্ট্র হলে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সহযোগিতা দিতে পারে তা বোঝা যায়। তবে কোন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে আদালত ইতোমধ্যে স্বাধীনতার আবেদন সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছে। আদালতের মতে, সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতার ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জমি ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অথচ তাদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা হয়নি। তবুও প্রিমিয়ার স্মিথ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন এবং বলেছেন, একজন বিচারকের মাধ্যমে আলবার্টার লাখো মানুষের কণ্ঠ রোধ করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে ‘চিরকাল কানাডিয়ান’ নামের একটি ঐক্যপন্থি সংগঠন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী টমাস লুকাজুক, ইতোমধ্যে প্রায় চার লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে কানাডার অংশ হিসেবে থাকার পক্ষে।
বর্তমানে আলবার্টার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখের কিছু বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যেই তীব্র প্রচারণা চলবে। প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ বলেছেন, স্বাধীনতাপন্থিদের কিছু অভিযোগ যৌক্তিক হলেও আলবার্টা সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বেশ কিছু বড় অর্জন আদায় করতে পেরেছে, যার মধ্যে নতুন জ্বালানি পরিবহন প্রকল্পও রয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, যিনি নিজেও আলবার্টার এডমন্টনে বেড়ে উঠেছেন, বারবার বলেছেন যে আলবার্টা কানাডার জ্বালানি ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু। বিরোধীদলীয় রক্ষণশীল নেতা পিয়ের পোয়েলিভরেও জাতীয় ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে স্বাধীনতাপন্থি নেতা রাথ এই প্রস্তাবিত গণভোটে সন্তুষ্ট নন। তার অভিযোগ, জনগণকে প্রকৃত স্বাধীনতার প্রশ্নে ভোটের আশা দেখিয়ে এখন ভিন্ন পথে নেওয়া হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, স্মিথের শাসক দলের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেওয়া হতে পারে।
আদিবাসী নেতারাও আদালতের রায় উপেক্ষা করে ভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক বলে সমালোচনা করেছেন। যদিও স্মিথ পরিষ্কার করেছেন, স্বাধীনতার পক্ষে ভোট এলেও সেটি সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করবে না; বরং আরও জটিল সাংবিধানিক ও আইনগত ধাপ অতিক্রম করতে হবে। তিনি বলেন, ফল যাই হোক না কেন, তিনি তা মেনে নেবেন এবং আলবার্টাকে কানাডার অংশ হিসেবেই রাখার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাবেন।
তবে জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ আলবার্টাবাসী এখনো কানাডার অংশ হিসেবেই থাকতে চান। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি জরিপে মাত্র ২৮ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে মত দেন, যার মধ্যেও অনেকেই এটিকে প্রতীকী সমর্থন বলে উল্লেখ করেছেন। মার্চের আরেকটি জরিপে ২৬ শতাংশ সমর্থন দেখা যায়। আর এপ্রিলের জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থনে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।