বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে শীতল যুদ্ধ, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন আজ এমন এক বৈশ্বিক সামরিক অবকাঠামো দাঁড় করিয়েছে, যার তুলনা ইতিহাসে খুবই বিরল। বিভিন্ন গবেষণা ও সামরিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৫০টির মতো সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং বিদেশে মোতায়েন সেনা ও বেসামরিক কর্মীর সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি। এই উপস্থিতি শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়; বরং কৌশলগত প্রভাব বিস্তার, দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করছে। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী; বিশেষ করে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও স্পেন—এই চার দেশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ। জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে, যা ইউরোপে সবচেয়ে বড় উপস্থিতি; রামস্টেইন এয়ার বেস, স্টুটগার্টে ইউরোপ ও আফ্রিকা কমান্ডের সদর দপ্তর এবং ল্যান্ডস্টুল সামরিক হাসপাতাল—এসব স্থাপনা শুধু ইউরোপ নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় মার্কিন অভিযানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ইতালিতে প্রায় ১৩ হাজার এবং স্পেনে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মার্কিন সেনা রয়েছে; স্পেনের রোটা নৌঘাঁটি ও মোরন বিমানঘাঁটি এবং ইতালির বিভিন্ন ঘাঁটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি নিশ্চিত করে। যুক্তরাজ্যে ১৫টিরও বেশি ঘাঁটিতে প্রায় ১২ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা নজরদারি, পারমাণবিক সক্ষমতা ও বিমান হামলার প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; সব মিলিয়ে ইউরোপে মার্কিন উপস্থিতি ন্যাটো জোটের নিরাপত্তা কাঠামোর মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি মূলত চীন ও উত্তর কোরিয়ার প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে; জাপানে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১২০টি ঘাঁটি এবং প্রায় ৫০ হাজারের বেশি সেনা, যেখানে ওকিনাওয়া দ্বীপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার সেনা অবস্থান করছে এবং ক্যাম্প হামফ্রিজ যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত; পাশাপাশি গুয়াম, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরেও গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে, যা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিনের ও অত্যন্ত কৌশলগত; কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি সবচেয়ে বড় ঘাঁটি, যেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা রয়েছে এবং এটি সেন্টকমের ফরোয়ার্ড হেডকোয়ার্টার হিসেবে কাজ করে। বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত, যা পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে; কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান ও ইরাকেও একাধিক ঘাঁটি রয়েছে, যা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। আফ্রিকায় তুলনামূলক কম হলেও জিবুতির ক্যাম্প লেমনিয়ে সবচেয়ে বড় ঘাঁটি, যেখানে ৪ হাজারের বেশি সেনা রয়েছে; এছাড়া কেনিয়া, সোমালিয়া ও নাইজারে ছোট ঘাঁটি রয়েছে, যা মূলত ড্রোন অপারেশন ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলেও উপস্থিতি রয়েছে; কিউবার গুয়ানতানামো বে সবচেয়ে পুরোনো ঘাঁটি, যেখানে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার সেনা রয়েছে; পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড, কানাডা ও বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চলে নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের পেছনে রয়েছে দ্রুত মোতায়েন ও লজিস্টিক সুবিধা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি রুট নিয়ন্ত্রণ, মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি—বিশেষত চীন ও রাশিয়ার প্রভাব প্রতিরোধের লক্ষ্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপে সেনা কমানোর মতো সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিলেও, সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি কমাচ্ছে না; বরং কৌশলগতভাবে নতুনভাবে শক্তিশালী করছে। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সেনা মোতায়েন বিশ্ব রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় বাস্তবতা—এটি শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতীক; ইউরোপ থেকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতে সহায়তা করছে। তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান ইস্যু এবং মিত্রদের সঙ্গে মতবিরোধ, এই উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে—যুক্তরাষ্ট্র কি তার বৈশ্বিক সামরিক ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করছে, নাকি আরও শক্তিশালী করছে—এই উত্তরই আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
কোন দেশে কত মার্কিন ঘাঁটি, কত সেনা মোতায়েন
Oplus_131072
You Might Also Like
Sign Up For Daily Newsletter
Be keep up! Get the latest breaking news delivered straight to your inbox.
[mc4wp_form]
By signing up, you agree to our Terms of Use and acknowledge the data practices in our Privacy Policy. You may unsubscribe at any time.
Create an Amazing Newspaper
Discover thousands of options, easy to customize layouts, one-click to import demo and much more.
Learn More