বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর। ৩০ বছরের জন্য কার্যকর এই চুক্তির মেয়াদ আগামী বছর শেষ হচ্ছে। ফলে চুক্তি নবায়ন হবে, নাকি নতুন কোনো চুক্তির পথে হাঁটবে—এ নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে বিষয়টি। যদিও এ বিষয়ে আলোচনার জন্য যে যৌথ কমিটি গঠনের কথা ছিল, এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় দুই দেশই সমবণ্টনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ফারাক্কা পয়েন্টে নদীর প্রবাহ অনুযায়ী পানি ভাগ করার সিদ্ধান্ত ছিল এর মূল ভিত্তি। তবে নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই চুক্তির একটি বড়সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। কারণ শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীতে পানির প্রবাহ সর্বনিম্ন থাকে, তখনই বাংলাদেশের প্রাপ্য অংশ সবচেয়ে বেশি কমে যায়। যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ বছরে চুক্তির শর্ত মেনেই দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন হয়েছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশ সব মৌসুমেই চুক্তি অনুযায়ী ন্যায্য হিস্যা পেয়েছে। তবে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রকাশিত তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সেসব বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাস্তবে বাংলাদেশ প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পানি পায়নি। চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক বছর বাকি থাকলেও যৌথ নদী কমিশনের সাম্প্রতিক দুটি বৈঠকে নবায়ন বা নতুন চুক্তি নিয়ে কোনো স্পষ্ট আলোচনা হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের
সরকারপ্রধানদের বৈঠকে বিষয়টি উঠে আসে। তখন সিদ্ধান্ত হয়—চুক্তি নবায়ন হবে নাকি নতুনভাবে করা হবে, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দুই দেশের কেউই সেই কমিটি গঠন করেনি।যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ আবুল হোসেন জানান, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত
গাইডলাইনের ভিত্তিতে একটি চার সদস্যের দল নিয়মিত দায়িত্ব পালন করত এবং সেই কাঠামোর মধ্যেই পানিবণ্টন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অন্যদিকে, যৌথ নদী কমিশনের বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ পানি পেলেও সেই পরিমাণ অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকে। তাঁর মতে, ফারাক্কা ব্যারাজে মাঝেমধ্যে গড় প্রবাহের চেয়েও কম পানি আসে, যা প্রশ্ন তৈরি করে। ফারাক্কার উজানে কোনো জলাধার তৈরি হচ্ছে কি না, অথবা পানি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না—এই বিষয়গুলো চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তিনি আরও বলেন, যদি চুক্তি নবায়ন করা হয় বা নতুন কোনো চুক্তি করা হয়, তাহলে বাংলাদেশকে এখন থেকেই ঠিক করতে হবে—কোন কোন নতুন শর্ত যুক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পানির প্রকৃত প্রবাহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্পষ্টতা জরুরি।গঙ্গা নদীতে পানিপ্রাপ্তি নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি ইতিবাচক দিক হলো—তিস্তা নদীসহ আরও ছয়টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। তবে এসব চুক্তির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনা, পারস্পরিক সমঝোতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তির ২৯ বছর, সামনে কি সিদ্ধান্তে যাচ্ছে বাংলাদেশ – ভারত?
