আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই সঙ্গে আয়োজিত গণভোটকে সামনে রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট আইনগত ব্যাখ্যা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের মতে, গণভোটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো পক্ষ নেওয়ার সুযোগ নেই এবং ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালালে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আইনগত নিষেধাজ্ঞাগত মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) এবং গণভোট অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট ধারা ও অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে জানান, শুধু ভোটগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই নন, যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি গণভোটের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তবে তিনি দণ্ডনীয় অপরাধে দোষী হবেন।নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কমিশন নিজে গণভোট সম্পর্কে ভোটারদের সচেতন করতে তথ্যভিত্তিক প্রচার চালাচ্ছে—যেমন ব্যালটে কীভাবে ভোট দিতে হবে, ভোটগ্রহণ পদ্ধতি ইত্যাদি। এটি কেবল অ্যাওয়ারনেস বিল্ডিং বা সচেতনতা তৈরির জন্য। তবে রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার পক্ষে বা বিপক্ষে মত প্রকাশ করতে পারবেন না। এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।উপদেষ্টাদের প্রচারণা নিয়ে ব্যাখ্যানির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা তো ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, উপদেষ্টারা সরকারি চাকুরে নন; তাঁরা পাবলিক সার্ভেন্ট। তাঁরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত নন। সে কারণে উপদেষ্টারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মত প্রকাশ করতে পারবেন। তাঁদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থ ব্যয়ে এ প্রচারণা চলছে—এটাই বাস্তবতা।
তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তাঁরা শুধু প্রচার চালাতে পারবেন না—বরং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়াই তাঁদের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ।নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা ওপরিপত্র প্রসঙ্গএই বিষয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে কোনোআনুষ্ঠানিক নির্দেশনা বা পরিপত্র জারি করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচনকমিশনের ভেতরে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনে পরি-
পত্র জারি করা হতে পারে। তবে পরিপত্র জারি না হলেও বিদ্যমান আইন কার্যকর রয়েছে।তিনি জানান, কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম সফরের সময় তিনি জেলা প্রশাসককে আইনগত বিষয়গুলো জানিয়েছেন।গণমাধ্যমকে এসব কথা জানানোর উদ্দেশ্য হলো—গণমাধ্যম যেন এই বিধি-নিষেধগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরে। কারণ আইন তো বলবৎ রয়েছেই।প্রযোজ্য আইন ও শাস্তির বিধানগণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) এর ৮৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—যদি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি তাঁর সরকারি পদমর্যাদার অপব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে তিনি সর্বনিম্ন এক বছর এবং সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। অন্যদিকে, গণভোট অধ্যাদেশ (অপরাধ, দণ্ড ও বিচার পদ্ধতি) এর ২১ ধারায় বলা হয়েছে—জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব কাজ অপরাধ বা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়, একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এসবক্ষেত্রেআরপিও ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে।আরেক নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যনির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা গণভোট সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক প্রচার করতে পারবেন। তবে তাঁরা কোনোভাবেই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে কিংবা বিপক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না।তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট—ভোটারদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা হবে, কিন্তু নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কেউ কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করবেন না। রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসাররা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন থেকেই তাঁরা নিরপেক্ষ থাকেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালানো কতটা আইনসংগত—এ প্রশ্নে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। সরকারি প্রচারণা ও পাল্টা দাবিএদিকে নির্বাচন কমিশনের এই অবস্থানের বিপরীতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে—গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণায় সরকারিকর্মকর্তাদের কোনো আইনগত বাধা নেই।তাঁদের যুক্তি হলো—বিদ্যমান সংবিধান, আরপিও, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ কিংবা গণভোট অধ্যাদেশে কোথাও বলা নেই যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইতিবাচকপরিবর্তনের পক্ষে কথা বলতে পারবেন না। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে গণভোটে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে—এটি নৈতিক ও গ্রহণযোগ্য বলেও দাবি করা হয়।বিশেষজ্ঞদের মতামতসংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন না। কারণ তাঁরা প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর বাইরের কেউ নন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যে বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য, তা উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য বেগম জেসমিন টুলি বলেন, গণভোটের জন্য আলাদা ও স্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা হয়নি। ফলে সংসদ নির্বাচনের আইনই এখানে প্রযোজ্য হয়েছে। এই অবস্থায় কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী গণভোটের কোনো পক্ষেই প্রচার চালাতে পারবেন না।গণভোটের বিষয়বস্তু: এক প্রশ্নে চার সিদ্ধান্তগণভোটে জনগণকে একটি মাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে হবে। প্রশ্নটি চারটি বিষয়ে প্রযোজ্য— নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন
দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা ও উচ্চকক্ষ গঠনজুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অন্যান্য সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নভোট গ্রহণ হবে গোপন ব্যালটেরমাধ্যমে।
গণভোটের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তাঁদের কোনো পক্ষ নেওয়ার সুযোগ নেই। এই বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় হবে।