গাজায় চলমান যুদ্ধকালজুড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ইসরায়েলকে সরাসরি সামরিক, গোয়েন্দা ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে লোহিত সাগর অঞ্চলে অবস্থিত নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল—এমন তথ্য উঠে এসেছে একটি ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে। নথিটি সংগ্রহ করেছে বলে দাবিকরেছেঅনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম এমিরেটলিকস।নথিটি অক্টোবর ২০২৩ সালের এবং এটি ইউএই সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অভিযান কমান্ডের উদ্দেশে প্রণীত। এতে লেখক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে হামদান বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান–এর নাম, যিনি আল-ধাফরা অঞ্চলের প্রতিনিধি এবং ইউএই রেডক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।নথির শুরুতে ‘৭ অক্টোবরের হামলা’র প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’র আলোকে ইসরায়েল-
কে সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে জানানো হয়, যৌথ অভিযান কমান্ডের নির্দেশ অনুযায়ী দক্ষিণ লোহিত সাগর অঞ্চলে অবস্থিত ইউএই সামরিক ঘাঁটিগুলো—যেমন ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের আল-মোখা, ইরিত্রিয়ার মাসাওয়া ও আসাব এবং সোমালিয়ায় অবস্থিত ঘাঁটিসমূহ—ইসরায়েলকে সহায়তার জন্য ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।বিশেষভাবে ইয়েমেনে অবস্থিত ঘাঁটি। গুলোকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা দিয়ে প্রস্তুত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতেসরাসরিবলাহয়েছে,‘ফিলিস্তিনে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েল-কে শক্তিশালী করা’ প্রয়োজন এবং ‘সন্ত্রাসীরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত’ এই সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে তথাকথিত ‘সামাজিক সংহতি’ বাড়াতে বিভিন্ন ‘কমিউনিটি উদ্যোগ’ চালু রাখার কথাও এতে রয়েছে।নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও সমন্বিত সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। এতে দাবি করা হয়, ইসরায়েলকে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের গোয়েন্দা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে।নথির একাংশে কাতার–এর ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করা হয়। সেখানে হামাসকে কাতারের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, কুয়েতও কাতারের সঙ্গে মিলিত হয়ে ফিলিস্তিনে যুদ্ধরত গোষ্ঠীগুলোকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। এটিকে ইউএইর রাষ্ট্রীয় নীতি ও কুয়েতের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরিপন্থী হিসেবে বর্ণনা করা হয়।নথিতে আরও বলাহয়,ইসরায়েলের সঙ্গে ইউএইর পূর্ববর্তী সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সংকটকাল ও স্বাভাবিক সময়—উভয় ক্ষেত্রেই সহযোগিতা করা তাদের দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক,অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তি–এর পর থেকে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২০সালেস্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে ইউএই আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশকে এই চুক্তিতে যুক্ত করতে তৎপরতা চালিয়ে আসছে।এর আগেও, ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন যুদ্ধ শুরুর পর, ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ইউএই ইয়েমেনের বিভিন্ন বন্দর, দ্বীপ ও নৌপথে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলে। একইভাবে সোমালিয়ার উপকূলীয় এলাকাতেও ইউএই সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে।
গাজায় গণহত্যা শুরুর পর থেকে আবুধাবি ও তেল আবিবের মধ্যে কৌশলগত সামরিক সম্পর্কআরওজোরদার হয়েছে। বর্তমানে ইউএই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় আরব বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবেও বিবেচিত।২০২৪ সালে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম বালকান ইনসাইট জানায়, ইউএই–সংযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান ইয়ুগোইমপোর্ট–এসডিপি
আর সামরিক বিমানের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ ডলারের অস্ত্র ইসরায়েলে রপ্তানি করেছে, যা গাজায় চলমান যুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।এ ছাড়া ইউএইভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সাবেক মোসাদ প্রধানের সহ-প্রতিষ্ঠিত সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি XM Cyber–এর সঙ্গে চুক্তি করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটি Rafaelসহ ইসরায়েলের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে, যার লক্ষ্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি, তেল ও তথ্য অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।একই সঙ্গে ইউএইর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা জোট EDGE Group ইসরায়েলের শীর্ষ অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাফায়েল ও Israel Aerospace Industries–এর শেয়ার ধারণ করে বলেও নথি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।