সাম্প্রতিক সময়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস(এলপিজি)
সিলিন্ডারের প্রাপ্যতা নিয়ে যে সংকটের কথা বলাহচ্ছে,
তার পেছনে প্রকৃতপক্ষে কোনো সরবরাহ ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তাঁর ভাষায়, সম্প্রতি এলপিজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সাময়িক সংকটের মূল কারণ আমদানি বা উৎপাদনে ব্যর্থতা নয়; বরং পাইকার ও খুচরা পর্যায়ের কিছু ব্যবসায়ীর পরিকল্পিত যোগসাজশ ও কারসাজি।মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা জানান।উপদেষ্টা বলেন, দেশে এলপিজি ব্যবসার প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারের অংশগ্রহণ মাত্র প্রায় ২ শতাংশ, যেখানে প্রোপেন ও বিউটেন আমদানি করে সেগুলো বোতলজাত করা হয়। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)–এর সাম্প্রতি মূল্য সমন্বয়কে ঘিরে কিছু বেসরকারি অপারেটরভোক্তাদের সুযোগ নিতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে।গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে ফাওজুল কবির খান বলেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এলপিজি বাজারে যেকোনো ধরনের অনিয়ম বা কারসাজি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি উল্লেখ করেন, এলপিজির মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত বিইআরসির হাতে। এ বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য জ্বালানি সচিব ও বিইআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। পরবর্তীতে জ্বালানি সচিবের সঙ্গে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিনিধি-দের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।উপদেষ্টার মতে, আগের মাসের তুলনায় বর্তমানে এলপিজি আমদানির পরিমাণ বেড়েছে, ফলে প্রকৃত কোনো সরবরাহ সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে বিইআরসির সাম্প্রতিক মূল্য সমন্বয়ের পর কিছুঅপারেটর বেশি দামের প্রত্যাশায় সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।তিনি বলেন, প্রতি সিলিন্ডারে ৫০ টাকার বেশি দামে যে সাম্প্রতিক বৃদ্ধি দেখা গেছে, তা কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ভোক্তাদের শোষণের ফল। এই মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক বাজারচক্রের অংশ নয়; বরং এটি পরিকল্পিত যোগ-
সাজশের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার দেশজুড়ে অভিযান চালাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মজুদদারি, জোরপূর্বক দোকান বন্ধ রাখা এবং কৃত্রিম সংকট রোধে জেলা পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি জানান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব জেলা প্রশাসনগুলোকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি সর্বশেষ আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠকেও পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর উপস্থিতিতে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়েছে। এলপিজি আমদানি ও বোতলজাতকরণের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রামে জ্বালানি বিভাগের মনিটরিং টিম পাঠানো হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের তদারকি কার্যক্রম চলছে। উপদেষ্টার মতে, এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি এবং ধীরে ধীরে বাজারে দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যবস্থার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, কিছু জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক শিপিংয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে চলতি মাসে এর কোনো তাৎক্ষণিক প্রভাব এলপিজি সরবরাহে পড়েনি, যদিও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালিত মোবাইল কোর্টে জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব আউটলেট ইচ্ছাকৃতভাবে বিক্রি বন্ধ রেখেছিল, সেগুলো পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।বিইআরসির ভূমিকা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও সবঅংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই কমিশন গঠন করাহয়েছে।
এটি একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া, যেখানে ক্রেতা, বিক্রেতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সবাই যুক্ত থাকে। সরকার ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করতে চায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।সামগ্রিক গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে তিনি পুনরায় জানান, দেশে পর্যাপ্ত দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হচ্ছে। শীতকালে গ্যাস পাইপলাইনে যে চাপ সৃষ্টি হয়, সেটি একটি মৌসুমি ও কারিগরি বিষয়—এটি কোনো সরবরাহ ব্যর্থতার ইঙ্গিত নয়।