স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে—গ্রিনল্যান্ড দখল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে।
ওয়াশিংটনের এমন কঠোর অবস্থানের ফলে ন্যাটো মিত্র ডেনমার্ক–এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টি ফের আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই ভূখণ্ডের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
বিরল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিক ও সামরিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় অঞ্চলটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব ঠেকাতে এটি প্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ও তাঁর উপদেষ্টারা এ বিষয়ে নানা কৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন এবং কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের বিকল্পও সব সময় খোলা রয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক—উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে। তবে গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎজফেল্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, ২০২৫ সাল থেকেই তারা মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের অনুরোধ জানিয়ে আসছেন, কিন্তু এখনো ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকে রাসমুসেন আশা প্রকাশ করেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও–এর সঙ্গে বৈঠক হলে বিদ্যমান ভুল বোঝাবুঝির অবসান হতে পারে।
অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর মতে, কেবল গ্রিনল্যান্ডের জনগণই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রাখে।
ইতোমধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড ও স্পেন প্রকাশ্যে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই সমর্থনের জন্য নিলসেন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে প্রায় ৫৭ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে এবং সেখানে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত আছে। গত রোববার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় চলমান মার্কিন অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো–কে আটকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, আগামী দুই মাসের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ইউরোপীয় নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ এবং উভয়ই ন্যাটোর সদস্য। সুতরাং এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডেরই রয়েছে।
ডেনমার্কের রয়্যাল ডিফেন্স কলেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মার্ক জ্যাকবসেন ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘পুরোনো রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও ট্রাম্পের দাবি—ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অক্ষম।
তবে বাস্তবতায় কোপেনহেগেন নিরাপত্তা জোরদারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। গত বছরই দেশটি প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ড্যানিশ ক্রোনার (প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বরাদ্দ দিয়েছে।