ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ সমমনা আটটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রার্থী নির্ধারণ ও আসনসমঝোতা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। একাধিক দফা বৈঠক হলেও কিছু দলের উচ্চ প্রত্যাশার কারণে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি আসনে সমঝোতার প্রস্তাব জামায়াতের কাছে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যেসবচেয়ে বেশি আসনে প্রার্থী দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলগুলোর শীর্ষ নেতারা জানান, আলোচনার প্রক্রিয়া এখন শেষ ধাপে রয়েছে। শনিবার রাতে শীর্ষ পর্যায়ের আরেকটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। আজ না হলেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করে
আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।নির্বাচনে বিজয়ের লক্ষ্য সামনে রেখে আটটি দল নানামুখী কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় সব দলই আলাদাভাবে সংসদ সদস্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। তবে সমঝোতা হলে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা হবে। মূল লক্ষ্য হলো ‘ওয়ান বক্স পলিসি’—অর্থাৎ একটি আসনে একজন প্রার্থী রেখে সব ইসলামী দলের ভোট এক বাক্সে নিশ্চিত করা।জানা গেছে, গত ৯ ডিসেম্বর থেকে আসন সমঝোতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। এখনো তা সম্পূর্ণ হয়নি। তবে শিগগিরই প্রতিটি আসনের জন্য একক প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হবে। এরই মধ্যে শতাধিক আসনে বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এসেছে। বিশেষ করে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রিকশা প্রতীকে অন্তত ৩৫টি আসনে শক্ত প্রার্থী রয়েছে বলে দাবি করছে।গত সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকটি অভিন্ন দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন চালিয়ে আসছে এই আটটি দল। জামায়াত ছাড়াও এতে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে—জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন, নির্বাচনে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং ফ্যাসিবাদের সহযোগী হিসেবে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলকে নিষিদ্ধ করা।এই দাবিতে তারা ইতোমধ্যে একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে বিভাগীয় সমাবেশের পর এখন জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন কর্মসূচি পালন করছে। আসন সমঝোতা প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও আট দলের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আজাদ জানান, এই আট দলের উদ্যোগ কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী জোট নয়। বরং সমঝোতার ভিত্তিতে একক প্রার্থী নির্ধারণই তাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, বিভিন্ন দল প্রস্তাব দিতে পারে, তবে আলোচনার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এনসিপির সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি জানান, একাধিক বৈঠক হলেও আলোচনা এখনো চলমান। এক আসনে একজন প্রার্থী রাখার নীতিতেই তারা এগোচ্ছেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন বলেন,
ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও ফরিদপুর অঞ্চলে তাদের অন্তত ৩৫টি শক্ত আসন রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এক দায়িত্বশীল নেতা জানান, তারা ৮০ থেকে ১০০টি আসনে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে।
অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের আরেক নেতা বলেন, তারা অন্তত ১০টি আসনে নির্বাচন করতে আগ্রহী। তবে তিনি স্বীকার করেন, জামায়াতে ইসলামী একটি বড় দল হওয়ায় তাদের সক্ষমতাও তুলনামূলক বেশি।জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম জানান, নতুন নতুন দল যুক্ত হওয়ায় আলোচনার পরিধি বেড়েছে। তাই নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে, তবে দ্রুত সমাধানে পৌঁছাতে তারা আগ্রহী।
এবি পার্টির যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাসূত্র জানায়, জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই প্ল্যাটফর্মে নতুন করে যুক্ত হতে পারে এবি পার্টি। দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং আসন সমঝোতার ভিত্তিতেই তারা যুক্ত হতে চায়। এবি পার্টির এক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই একসঙ্গে কাজ করার আলোচনা চলছিল। নির্দিষ্ট আসনে সমঝোতা হলে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের ভিন্ন অবস্থান
অন্যদিকে, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন এই সমঝোতায় যাচ্ছে না। সংগঠনটির সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তারা দুই বড় রাজনৈতিক ধারার বাইরে একটি বিকল্প গণতান্ত্রিক শক্তি গড়ে তুলতে চায়। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু দল নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে বড় দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটছে, যা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।তার মতে, গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের লক্ষ্য ছিল বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি স্পষ্ট অবস্থান তৈরি করা। কিন্তু জোটসঙ্গী কিছু দলের সাম্প্রতিক তৎপরতায় সেই অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
ঝুলে আছে ৮ দলের আসন নিয়ে সমঝোতা
