রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ক্যানডিডা অরিস নামে এক ধরনের বিপজ্জনক ছত্রাকের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘সুপারবাগ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, কারণ এটি সহজে নিরাময়যোগ্য নয় এবং প্রচলিত ছত্রাকনাশক ওষুধের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি অংশ এই ছত্রাকে সংক্রমিত হচ্ছেন, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন এবং যান্ত্রিক শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়তা, কেন্দ্রীয় শিরা ক্যাথেটার বা মূত্রনালির ক্যাথেটারের মতো আক্রমণাত্মক চিকিৎসা নিয়েছেন।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে আইসিডিডিআর,বি। এতে সহযোগিতা করেছে আইইডিসিআর এবং কারিগরি সহায়তা দিয়েছে সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক একটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাসে ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি মোট ৩৭২ জন রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এতে দেখা যায়, নিবিড় পরিচর্যায় থাকার কোনো এক পর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ রোগী ক্যানডিডা অরিসে সংক্রমিত হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে তা ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক গবেষণায় উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম পাওয়া গেছে।
ক্যানডিডা অরিস অনেক সময় ত্বকে কোনো উপসর্গ ছাড়াই বসবাস করতে পারে, যা কলোনাইজেশন নামে পরিচিত। তবে গুরুতর অসুস্থ বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এটি রক্তে প্রবেশ করে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় সব নমুনাই ফ্লুকোনাজল নামের প্রচলিত ছত্রাকনাশক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভরিকোনাজলও কার্যকর নয়। এই দুটি ওষুধ সাধারণত প্রথম ও দ্বিতীয় সারির চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিছু ক্ষেত্রে একাধিক ওষুধ প্রয়োগ করেও কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি, যা চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তুলছে।
গবেষকদের মতে, রোগীদের ভর্তি করার পর ভিটেক-২ পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে তাদের ত্বক ও রক্তে জীবাণুর উপস্থিতি যাচাই করা হয় এবং এতে হাসপাতালের ভেতরেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নির্বাচিত নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পাওয়া ক্যানডিডা অরিস মূলত দক্ষিণ এশীয় ধরনভুক্ত, যা ইঙ্গিত দেয় যে এটি এখন এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞরা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সংক্রমিত বা জীবাণুবাহী রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা, হাসপাতালের পরিবেশ নিয়মিত ক্লোরিনভিত্তিক জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার রাখা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটে নিয়মিত স্ক্রিনিং চালু করা এবং ছত্রাকনাশক ওষুধের সংযত ও যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করা। গবেষকদের মতে, সারা দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে বৃহৎ পরিসরে আরও গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন।
ঢাকার আইসিইউতে ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক
