মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনো সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা পারমাণবিক পর্যায়ে গড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ আই আই এস এস। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক কৌশলগত মূল্যায়নে সংস্থাটি জানায়, উভয় দেশই প্রতিপক্ষের কমান্ড, যোগাযোগ ও গোয়েন্দা অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাতে পারে, যা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলবে।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এশিয়ার বৃহত্তম বার্ষিক প্রতিরক্ষা সম্মেলন ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’-এর আগে প্রকাশিত ১৫৬ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ব এখন নতুন এক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এবং এর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সম্প্রসারণ করছে, পাশাপাশি অনেক অ-পারমাণবিক রাষ্ট্রও দূরপাল্লার প্রচলিত হামলা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, যা কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন আই আই এস এস-এর এই মূল্যায়নকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান ইস্যু পুরোপুরি চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিংও যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ান ইস্যু অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনার আহ্বান জানান।
এদিকে তাইওয়ান, ইরান সংকট এবং এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবারের শাংরি-লা ডায়ালগে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা প্রধান, কূটনীতিক, বিশ্লেষক এবং অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
প্রতিবেদনটি এমন সময় প্রকাশিত হলো যখন চলতি মাসে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের পর তাইপেতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বেইজিং বরাবরই বলে আসছে, তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ হিসেবে দেখে তারা এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতেও পিছপা হবে না, যদিও তারা “শান্তিপূর্ণ পুনঃএকত্রীকরণ”-কেই অগ্রাধিকার দেয়। অন্যদিকে তাইওয়ানের সরকার চীনের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
চীন সম্প্রতি তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। ফলে দ্বীপটিতে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে তাইপে।
আই আই এস এস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানকে ঘিরে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামরিক লক্ষ্য ভিন্ন হলেও উভয় পক্ষই স্থল, নৌ, আকাশ, মহাকাশ ও সাইবারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করতে পারে। চীনের লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দূরে রাখা, আর যুক্তরাষ্ট্র চাইবে তাইওয়ানের প্রতিরোধ সক্ষমতা শক্তিশালী করতে।
প্রতিবেদনটি আরও সতর্ক করে বলেছে, বর্তমানে এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই যে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে এমন “গার্ড রেইল” বা সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে, যা পারমাণবিক পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে উভয় পক্ষই যদি একে অপরের কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ, গোয়েন্দা ও নজরদারি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
আই আই এস এস-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানিয়েল স্যালিসবারি বলেন, সাম্প্রতিক ট্রাম্প-শি বৈঠকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা ঝুঁকি হ্রাস নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শীতল যুদ্ধের সময় দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা চললেও চীনের সঙ্গে তেমন কোনো কাঠামোগত আলোচনা সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। চীনের পারমাণবিক সক্ষমতার বড় অংশ গোপন থাকায় এ ধরনের আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এখনো চীনের তুলনায় অনেক বড়, তবুও মার্কিন কর্মকর্তারা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন করছে।
গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে চীন এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে রাশিয়ার কাছে প্রায় ৪,৪০০, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩,৭০০ এবং চীনের কাছে প্রায় ৬২০টি সক্রিয় পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে।