বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করেছে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২১ মাইল প্রশস্ত এই জলপথের মাঝখান দিয়ে চলাচলের পরিবর্তে জাহাজগুলোকে এখন ইরানি উপকূলের খুব কাছ দিয়ে এবং কেশম ও লারক দ্বীপের মধ্যবর্তী পথ দিয়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে এটি এখন ‘তেহরান টোলবুথ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই রুট ব্যবহার করতে হলে জাহাজ মালিকদের এখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারী কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে কার্গোর ধরন, গন্তব্য এবং প্রকৃত মালিকানা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দিয়ে একটি জটিল ও ব্যয়বহুল আলোচনার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ইরান বর্তমানে এই পথ দিয়ে চলাচলের জন্য প্রতি ব্যারেল তেলের ওপর অন্তত ১ ডলার করে ‘টোল’ আদায় করছে। সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে এই মাশুল আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এই ফি পরিশোধ করতে হচ্ছে চীনা ইউয়ান অথবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে। হিসাব অনুযায়ী, একটি একক তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য গড়ে প্রায় ২০ লাখ ডলার টোল দিতে হচ্ছে। সব অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর আইআরজিসি-র স্পিডবোটগুলো জাহাজটিকে টোলবুথ এলাকা পার করে দেওয়ার জন্য এসকর্ট বা পাহারা দিয়ে থাকে। বর্তমানে এই অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ ব্যবস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো এই টোল ব্যবস্থা বন্ধ করা। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্তই হচ্ছে হরমুজ প্রণালীর ‘সম্পূর্ণ, অবিলম্বে এবং নিরাপদ উন্মুক্তকরণ’। তবে ইরান পাল্টা বিবৃতিতে জানিয়েছে, যেকোনো পারাপার তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ‘যৌথভাবে’ সম্পন্ন করতে হবে। এদিকে ট্রাম্প এক পর্যায়ে রসিকতা করে বলেন, “আমরাই তো বিজয়ী, তাহলে আমরা কেন টোল নেব না?” উপসাগরীয় দেশগুলো উদ্বিগ্ন যে, ট্রাম্প হয়তো বড় ধরনের বোমাবর্ষণ শেষে হরমুজ প্রণালীকে তেহরানের নিয়ন্ত্রণেই রেখে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে যেতে পারেন। আবুধাবি, কাতার এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলোর বিকল্প পাইপলাইন না থাকায় এবং এলএনজি সরবরাহের জন্য জাহাজের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা এই মাশুল দিতে বাধ্য হতে পারে। ভারতও সম্ভবত টোলের চাপ মেনে নিয়েই নিজস্ব ট্যাংকার পাঠাবে। রয়টার্সের কলামিস্ট হুগো ডিক্সনের অনুমান অনুযায়ী, নতুন পাইপলাইন তৈরি হতে যে সময় লাগবে, সেই সময়ের মধ্যে আগামী পাঁচ বছরে তেহরান এই টোল থেকে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। এই বিপুল অর্থ শিয়া প্রধান দেশটিকে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করবে এবং আইআরজিসি তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত সামরিক শক্তিকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল এনার্জি সেন্টারের সিনিয়র ফেলো এলেন আর. ওয়াল্ড বলেন, “ইরান যদি এই ‘টোলবুথ’ ব্যবস্থা চালু রাখে, তবে এই যুদ্ধ শেষ হওয়া কঠিন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এটি মেনে নেবে না; শেষ পর্যন্ত তাদের একটি সেনাবাহিনী গঠন করে লড়াইয়ে নামতে হবে।” তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহরের ট্যাংকারগুলো যুদ্ধের আগের তুলনায় দ্বিগুণ তেল পরিবহন করছে এবং লাভও করছে দ্বিগুণ। কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র লেকচারার ড. আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, এই টোলের অর্থ আইআরজিসি-কে একটি শক্তিশালী সামরিক একনায়কতন্ত্রে পরিণত হতে সাহায্য করবে, যা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ আর্থিক ও সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ কৌশলগত জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী বন্ধের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই সমাধান হয়। স্থায়ী কোনো টোল ব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই রুট ব্যবহার করতে জাহাজ মালিকদের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-সম্পর্কিত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্গোর ধরন, গন্তব্য ও প্রকৃত মালিকানা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দিয়ে জটিল ও ব্যয়বহুল আলোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
