দেশজুড়ে এখন নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক
দলগুলো নানা কর্মসূচি ও প্রচারণায় ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যস্ত সময় পার করছে। বলা যায়, পুরো দেশই এখন নির্বাচনের আবহে মুখরিত। বড়–ছোট মিলিয়ে অর্ধশতাধিক দল ভোটের মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দল ৩০০টি আসনের প্রতিটিতে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে, আবার কিছু দল আংশিক তালিকাও প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছুকরাও নিজ নিজ এলাকায় প্রচারণা শুরু করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক চর্চা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এসব মনোনয়ন তালিকার গভীর বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে যে বৈষম্য দেখা যাচ্ছে, তা রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অন্তর্ভুক্তির অঙ্গীকার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়—বিএনপি, এনসিপি এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়ন তালিকা তাদের ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ ও অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। গতকাল পর্যন্ত প্রকাশিত দুই দফায় বিএনপি ২৭৩টি আসনে যে প্রার্থীদের ঘোষণা করেছে, তাদের মধ্যে নারী মাত্র ১১ জন। এনসিপির ঘোষিত ১২৫টি আসনে নারী প্রার্থী রয়েছেন ১৪ জন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন সমমনা আট দলের তালিকায় একজনও নারী নেই। যদিও জামায়াতসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক স্তরে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক রাজনৈতিক দল এখনো ‘সহজ’ বা ‘নিরাপদ’ আসনে নারীকে মনোনয়ন দিতে চায়, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে তাদের প্রতি ভরসা রাখতে পিছিয়ে যায়। ফলে সংসদমুখী রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ কী নির্দেশ করে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী; সেই হিসেবে দলীয় পদ-পদবিতে নারী–পুরুষের অনুপাত অন্তত সমান হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২০০৮ সালে প্রণীত ও ২০২০ সালে সংশোধিত
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। যদিও এই নির্দেশনা মূলত দলীয় কমিটিতে নারী অন্তর্ভুক্তির জন্য, তারপরও সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেদলগুলোর সদিচ্ছা এই তালিকাগুলো দেখলেই বোঝা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইনগত বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে অন্তত ১৫–২০ শতাংশ আসনে নারী মনোনয়ন দেওয়া আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। কিন্তু এবারের মনোনয়ন পরিস্থিতি বলছে, বড় দলগুলো এখনো লক্ষ্যপূরণের পথে অনেক পিছিয়ে।কোন দলে নারী মনোনয়ন কত এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কিছু দল আগেভাগেই সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেছে। বিজেপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ বেশ কয়েকটি দল তালিকা প্রকাশ করেছে। সবচেয়ে বড় দল বিএনপি ২৭৩টি আসনে প্রার্থীর নাম প্রকাশ করলেও নারী সংখ্যা সেখানে খুবই কম—মাত্র ১১। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও নারী নেতৃত্বকে মাঠপর্যায়ে এগিয়ে নিতে দলের এই দুর্বলতা দৃশ্যমান। বিপরীতে, ছোট দল এনসিপি ১২৫ আসনের মধ্যে ১৪ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এটি দেখায় যে পরিসংখ্যান নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে পারে। জাগপার সাধারণ সম্পাদক রাশেদ প্রধান জানান, তাদের দলীয় প্রধান ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান নারী হওয়ায় দলটি নারী নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেয়। জোটগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পরবর্তী আলোচনায় নারী ও সংখ্যালঘু প্রার্থী অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান হামিদী এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতির মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইসলামী দলগুলো কেন নারী প্রার্থী দেয় না—বিশ্লেষকদের মত বিশ্লেষকদের মতে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়—অনেক দলই এখনও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতা–ভিত্তিক রাজনীতি থেকে দূরে। এনসিপির মতো নতুন প্রজন্মের দলের সাহসী সিদ্ধান্ত বড় দলগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তারা মনে করেন,গণতন্ত্রের পরিপূর্ণতা কেবল নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে নয়, বরং সমাজের সব শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত। জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলোর তালিকায় নারী না থাকার বিষয়ে ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, জামায়াত নারীদের বিষয়ে খুবই রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে—দলটি নারীদের ঘরের সীমার মধ্যেই দেখতে চায়। তাই এই জোটে নারী না থাকা আশ্চর্যের নয়। তবে বিএনপির কম নারী মনোনয়ন বিস্ময়কর, কারণ দলটি নিজেকে উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে দাবি করে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, ইসলামী দলগুলোর নারী কম মনোনয়নের পেছনে তিনটি কারণ দেখা যায়—১) ঐতিহ্যগত রক্ষণশীলতা ২) ধর্মীয় ব্যাখ্যা–নির্ভর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ৩) সরাসরি নির্বাচনে না দিয়ে সংরক্ষিত আসনের ওপর নির্ভরতা তার মতে, সরাসরি নারী মনোনয়ন না দেওয়া দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলছে।
‘নারী প্রার্থী নেই, জামায়াত সহ ৮ দলীয় ও জোটে’
