মানুষের দৃষ্টি যখন আড়ালে থাকে, রাতের গভীর নীরবতায় যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়—তখন কোনো এক বান্দা একান্তভাবে তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। সেখানে নেই কোনো দর্শক, নেই কোনো বাহবা বা প্রশংসার প্রত্যাশা। থাকে শুধু আল্লাহ ও তাঁর বান্দার গভীর আত্মিক সম্পর্ক। সে মুহূর্তে বান্দা নিজের গুনাহ, দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা স্মরণ করে নিজেকে তুচ্ছ মনে করে। অন্তরের গভীর থেকে অনুশোচনার যে অশ্রু ঝরে পড়ে, তা আর সাধারণ কান্না থাকে না—তা হয়ে ওঠে ইবাদত, তাওবার ভাষা এবং আল্লাহর নৈকট্যের নীরব আরজি। নির্জনে আল্লাহর ভয়ে কান্নাকারী ব্যক্তি মানুষের চোখে অচেনা হলেও আসমানের দরবারে সম্মানিত হয়ে যান। তার নিঃশব্দ অশ্রু দুনিয়া ও আখিরাতে রহমত, মর্যাদা এবং নিরাপত্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আরশের ছায়ায় বিশেষ আশ্রয় কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে, যখন সূর্য মানুষের মাথার খুব কাছে চলে আসবে, তখন আল্লাহ কিছু সৌভাগ্যবান বান্দাকে তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। তাদের একজন হলেন—
وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ
“যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করেছে এবং তার চোখ অশ্রুতে ভরে গেছে।”(সহিহ বুখারি: ৬৬০; সহিহ মুসলিম: ১০৩১) এটি কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তার ঘোষণা। জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপত্তা
আল্লাহর ভয়ে ঝরা অশ্রু জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। প্রিয় নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ) বলেছেন—
عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ “দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—একটি চোখ যা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে,
আর একটি চোখ যা আল্লাহর পথে পাহারায় রত থাকে।”। (সুনান তিরমিজি: ১৬৩৯)
গুনাহ মাফ ও অন্তরের পরিশুদ্ধতা নির্জনে কান্না মূলত গুনাহ স্বীকার ও আন্তরিক অনুশোচনার প্রকাশ। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ“যারা কোনো পাপ কাজ করে বা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।”
(সুরা আল ইমরান: ১৩৫) এ ধরনের কান্না হৃদয়কে পবিত্র করে এবং আত্মাকে আলোকিত করে। হৃদয়ের কোমলতা ও ঈমানের দৃঢ়তা যে হৃদয় আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে পারে, সে হৃদয় এখনো জীবিত। আল্লাহ বলেন—
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ
“মুমিনদের জন্য কি এখনো সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে তাদের হৃদয় বিনয়ী হবে?” (সুরা হাদিদ: ১৬)
এ কান্না ঈমানকে শক্ত করে এবং অন্তরে খুশু সৃষ্টি করে।
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন আল্লাহতলা হলো আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। তিনি বলেন—إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।”(সুরা বাকারা: ২২২)নির্জনে কান্নাকারী ব্যক্তি মূলত তাওবা ও আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর একজন বান্দা। কিয়ামতের দিন নিরাপদ চোখ। প্রিয় নবীজি প্রিয় নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ) বলেন— كُلُّ عَيْنٍ بَاكِيَةٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَّا…“কিয়ামতের দিন সব চোখই কাঁদবে; তবে তিনটি চোখ কাঁদবে না-যে চোখ হারাম থেকে নিজেকে সংযত রেখেছে,যে চোখ আল্লাহর পথে জেগে থেকেছে,আর যে চোখ থেকে আল্লাহর ভয়ে অতি সামান্য অশ্রুও বের হয়েছে।”(আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব: ২/২২৭) জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা আল্লাহভীতি জান্নাতের পথকে সহজ করে দেয়। আল্লাহ বলেন—। وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ
“যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।” (সুরা রহমান: ৪৬) আল্লাহর ভয়ে নির্জনে ঝরা অশ্রু কখনোই বৃথা যায় না। সে অশ্রু আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং বান্দার ভাগ্য বদলে দিতে সক্ষম হয়। মানুষ যদি আমাদের হাসতে দেখে, কিন্তু আল্লাহ যদি আমাদের নির্জনে কাঁদতে দেখেন—তাহলেই প্রকৃত সফলতা। হে আল্লাহ! আমাদের সেই সৌভাগ্যবান বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা আপনার ভয়ে নির্জনে কাঁদে, এবং আমাদের অশ্রু কবুল করুন। আমিন।
