যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘পাল্টা শুল্ক’ বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নীতি কার্যকর হওয়ার পর দেশটির সামগ্রিক পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি কমতে শুরু করেছে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি গত এক বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (USTR) প্রধান জেমিসন গ্রিয়ার।
সম্প্রতি ব্রিটিশ দৈনিক Financial Times-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে গ্রিয়ার বলেন, ২০২৫ সাল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির ইতিহাসে ‘শুল্কের বছর’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকতে পারে। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর দ্বিতীয় মেয়াদে গৃহীত নতুন শুল্কনীতি ও বাণিজ্য চুক্তিভিত্তিক কৌশল দেশটির পুনঃশিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।গ্রি জনয়ার লেখায় উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিজে ভালো বা মন্দ নয়; মূল প্রশ্ন হলো বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে কি না। তিনি বলেন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎপাদন কোথায় হচ্ছে তা বড় বিষয় নাও হতে পারে, কিন্তু মিশিগানের গাড়ি কারখানার শ্রমিক বা টেক্সাসের তুলা চাষির জীবিকার সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি জড়িত।এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন ‘শুল্ক ও চুক্তি’—এই দুইয়ের সমন্বয়ে একটি নতুন বাণিজ্য কাঠামো চালু করেছে। চলতি বছরের ৩১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উদ্বৃত্ত বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ১০ শতাংশ, স্বল্প ঘাটতির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ এবং বড় ঘাটতির ক্ষেত্রে আরও বেশি হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।নতুন এই কাঠামোর সূচনা হয় ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে। পরে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে হওয়া চুক্তিগুলোর আওতায় মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস, নন-ট্যারিফ বাধা দূর, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদার এবং জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। গ্রিয়ার জানান, এসব চুক্তির ফলে অংশীদার দেশগুলো আমদানি লাইসেন্স, দ্বৈত পরীক্ষার নিয়ম ও অবৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের মতো নন-ট্যারিফ প্রতিবন্ধকতা সহজ করতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল সেবা খাতে ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা, ডিজিটাল সার্ভিস কর আরোপ থেকে বিরত থাকা এবং সেবা খাতে বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।চুক্তিগুলোর অংশ হিসেবে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ এবং মার্কিন পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে শুল্ক ছাড়, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজারে ধারাবাহিক প্রবেশাধিকার দিয়েছে।গ্রিয়ারের দাবি অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খাতে পুনরুজ্জীবনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।তিনি আরও জানান, দক্ষিণ ক্যারোলিনায় ২৫ বছর পর ম্যাগনেট উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং ফিলাডেলফিয়া শিপইয়ার্ডে প্রায় ৫০ বছর পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ নির্মাণের অর্ডার এসেছে। ওষুধ, ধাতু ও অটোমোবাইল শিল্পেও নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসছে।তবে গ্রিয়ার স্বীকার করেন, কয়েক দশকে হারানো শিল্প সক্ষমতা দ্রুত পুরোপুরি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তাঁর মতে, পুনঃশিল্পায়নের জন্য শুল্কনীতির পাশাপাশি প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ শ্রমশক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর সংস্কার ও নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন অপরিহার্য, যা বর্তমান প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
