শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব মোকাবেলায় পশ্চিমা দেশগুলো সৌদি আরবের সহযোগিতা চেয়েছিল এবং এর ফলেই সৌদি অর্থায়নে বিশ্বজুড়ে ওয়াহাবি মতাদর্শের বিস্তার শুরু হয়—এমনটাই জানিয়েছেন মুহাম্মদ বিন সালমান; যুক্তরাষ্ট্র সফরের শেষ দিনে ২২ মার্চ এক আন্তর্জাতিক পত্রিকাকে দেওয়া প্রায় দেড় ঘণ্টার সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সে সময় সৌদি আরবের পশ্চিমা মিত্ররা মুসলিম দেশগুলোতে সোভিয়েত অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ব্যাপক উদ্যোগ নেয় এবং যাতে এসব দেশ সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে না চলে যায়, সে লক্ষ্যেই গত শতকের সত্তরের দশকে সৌদি আরবকে বিশেষভাবে সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়; এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশে মসজিদ ও মাদ্রাসায় অর্থ ব্যয় করে ওয়াহাবি চিন্তাধারার প্রচার শুরু করে সৌদি আরব; সুন্নি মুসলমানদের একটি ধারার মধ্যে এই মতবাদের সূচনা অষ্টাদশ শতকে আরবের নজদ অঞ্চলে মোহাম্মাদ ইবনে আবদ আল ওয়াহাবের -এর মাধ্যমে, যিনি ইবনে তাইমিয়্যাহ -এর চিন্তায় প্রভাবিত ছিলেন এবং ধর্মনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে মত দিতেন; প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর পশ্চিমা সমর্থনে সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সউদ পরিবারের সঙ্গে এই মতাদর্শের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে; বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭০ সাল থেকে কয়েক দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়, যার একটি অংশ উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হাতেও পৌঁছেছে বলে অভিযোগ রয়েছে; ২০১৩ সালে ইউরোপীয় সংসদ এই মতাদর্শকে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের অন্যতম উৎস হিসেবে আখ্যা দেয়; যুবরাজ আরও বলেন, শুরুতে যে অর্থায়ন সরকারিভাবে চালু হয়েছিল, পরে তা সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকেনি, বরং বিভিন্ন ফাউন্ডেশন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব যখন দুই প্রভাব বলয়ে বিভক্ত হয় এবং নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটে, তখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান দেখা যায়, যাদের অনেকেই এই মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে করা হয়; সাক্ষাৎকারে আরও একটি আলোচিত বিষয় ছিল, যেখানে কিছু গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল যে তিনি হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা -এর ওপর বিশেষ প্রভাব রাখেন, তবে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, ডেলান্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তিনি আরও জানান, কুশনারের সঙ্গে তার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও তা কোনোভাবেই গোপন তথ্য বিনিময় বা বিশেষ সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে নয়; একইভাবে তিনি মার্কিন নেতৃত্বের অন্যান্য ব্যক্তিদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক থাকার কথা উল্লেখ করেন; ইয়েমেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তারা অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে মানবিক পরিস্থিতি উন্নয়নে তারা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে; তিনি আরও বলেন, ভালো বা খারাপ সুযোগ বলে আলাদা কিছু নেই, বরং বাস্তবতা সবসময় কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; সবশেষে উল্লেখ করা হয়, এই সাক্ষাৎকারটি প্রথমে প্রকাশের জন্য নির্ধারিত ছিল না, পরে সৌদি দূতাবাসের অনুমতির ভিত্তিতে এর কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়, যার মাধ্যমে শীতল যুদ্ধকালীন কৌশল, ধর্মীয় মতাদর্শের বিস্তার এবং বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির একটি জটিল চিত্র সামনে আসে।
