১৬ বছর আগে পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞের তদন্তে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে হস্তান্তর করেছে। রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান এবং অন্য সদস্যরাএ প্রতিবেদন জমা দেন।প্রতিবেদন গ্রহণের সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে এই মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে জাতির মনে যে অজস্র প্রশ্ন ছিল, এই প্রতিবেদন তা পরিষ্কার করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই অনুসন্ধানে যে সত্য উন্মোচিত হয়েছে তা দেশের জন্য স্থায়ী সম্পদ হয়ে থাকবে। কমিশনপ্রধান জানান, ১৬ বছর পুরোনো ঘটনার আলামত অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তদন্ত ছিল চ্যালেঞ্জিং। তবু সাক্ষ্যগ্রহণ, পূর্ববর্তী তদন্তপত্র সংগ্রহ এবং নানা সূত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনাটির পেছনে থাকা সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বহিঃশক্তির সংশ্লিষ্টতার শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কমিশনের অন্য সদস্যরা জানান, ঘটনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তৎকালীন আওয়ামী লীগের কয়েকজ প্রভাবশালী নেতা জড়িত ছিলেন বলে কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। পিলখানায় ঢোকার সময় স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের একটি মিছিলকে অংশ নিতে দেখা যায় এবং ঘটনাটি ঘটানোর জন্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অনুমোদন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনপ্রধান আরও জানান, সেনাবাহিনী সে সময় কেন অভিযান চালায়নি—এ নিয়ে সেনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই পরিস্থিতিতে কোনো অভিযান ভারতীয় হস্তক্ষেপ ডেকে আনতে পারত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাকেও প্রতিবেদনে ‘গুরুতর’ বলা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে কমিশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরে ঘটনার আগে ও চলাকালে কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্থা দায়িত্বশূন্যতা দেখিয়েছে। বেশ কিছু ব্যক্তি, যাদের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, এখনো আইনগতভাবে অভিযুক্ত নন। কমিশনের মতে, এই হত্যাযজ্ঞে ভারতের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের দাবি, ওই সময় বাংলাদেশে আগত ৯২১ ভারতীয় নাগরিকের মধ্যে ৬৭ জনের অবস্থান মিলছে না।
তদন্তে বলা হয়েছে, বিডিআর সদস্যদের মধ্যে আগের থেকেই অসন্তোষ ছিল—ডাল-ভাত কর্মসূচি, অতিরিক্ত দায়িত্ব, এবং সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাবসহ নানা কারণ বিদ্রোহের পটভূমিতে কাজ করেছিল। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও বহিঃশক্তির পরিকল্পনাও এই হত্যাযজ্ঞকে ভয়াবহ করে তুলেছিল বলে কমিশন মত দিয়েছে। প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের জন্য বিস্তৃত সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পান। ২০০৯ সালের ২৫–২৬ ফেব্রুয়ারির ওই ঘটনায় তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালকসহ ৫৮ জন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। পূর্ববর্তী তদন্তেও দেখা যায়, বিপথগামী কিছু বিডিআর সদস্য ২০০৭ সাল থেকেই এই পরিকল্পনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার কথাও স্বীকার করেছিলেন। তবুও সেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।
“পিলখানা হত্যাযজ্ঞ: জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, রাজনৈতিক ও বহিঃশক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ উঠে এসেছে”
