আমরা ছিলাম পথহারা ও দিশেহারা, হেদায়াত ও সফলতার পথ সম্পর্কে ছিলাম সম্পূর্ণ অজ্ঞ; অতঃপর মহান রাব্বুল আলামীন হেদায়েতের বার্তা দিয়ে প্রেরণ করলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে, তিনি এসে আমাদেরকে সত্য-মিথ্যা চিনিয়েছেন, সত্য দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন, নাজাতের পথ দেখিয়েছেন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পন্থা শিক্ষা দিয়েছেন—এ ছিল আমাদের প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ; এই অনুগ্রহের বর্ণনা কুরআন মাজীদে এসেছে: لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ اِذْ بَعَثَ فِیْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ اَنْفُسِهِمْ یَتْلُوْا عَلَیْهِمْ اٰیٰتِهٖ وَ یُزَكِّیْهِمْ وَ یُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَةَ وَ اِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ—আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন; তিনি তাদেরই মধ্য হতে তাদের কাছে রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন, যদিও তারা আগে স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিল; নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন নবীদের সর্দার তেমনই তিনি মানুষ গড়ার শ্রেষ্ঠ কারিগর, তিনি এমন এক সমাজ রেখে গেছেন যার নজির ইতিহাসে বিরল, তাঁর ওহীভিত্তিক সমাজব্যবস্থা মানবতার প্রকৃত উন্নতি নিশ্চিত করেছে এবং এ কারণে তাঁকে এই উম্মতের জন্য মনোনীত করা আল্লাহর বিশেষ রহমত, তবে এই রহমত মূলত তাদের জন্য যারা ঈমান আনে; তিনি জগদ্বাসীর জন্য রহমত হয়ে এসেছেন—وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ—(হে নবী!) আমি তোমাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি; ইমাম ত্ববারী রাহ. বলেন, আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন—মুমিনদের জন্য হেদায়াত ও জান্নাতের পথ এবং কাফিরদের জন্যও তাৎক্ষণিক আযাব থেকে অবকাশ; মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী রাহ. বলেন, তাঁর জিহাদও ছিল ব্যাপক অর্থে রহমত, কারণ এর মাধ্যমে দ্বীনের সংরক্ষণ হয়েছে এবং বহু মানুষের অন্তর খুলে গেছে; উম্মতের প্রতি নবীজীর দরদ ছিল সীমাহীন—তিনি দয়া ও মমতার সাগর, উম্মতের কল্যাণে সদা ব্যাকুল; তিনি কোনো প্রতিদান চাননি, শুধু চেয়েছেন তাদের নাজাত; হাদীসে এসেছে তিনি কেঁদে বলতেন: اللهُمّ أُمّتِي أُمّتِي—‘হে আল্লাহ! আমার উম্মত! আমার উম্মত!’—আর আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنّا سَنُرْضِيكَ فِي أُمّتِكَ وَلَا نَسُوءُكَ—আমরা তোমাকে তোমার উম্মতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করব; তিনি উম্মতকে আগুন থেকে বাঁচাতে কোমর ধরে টানছেন অথচ তারা সরে যাচ্ছে—مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ…—এই উপমা তাঁর গভীর দরদের প্রমাণ; কুরআনে বলা হয়েছে: فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ…—তাদের ঈমান না আনার কারণে আপনি যেন দুঃখে প্রাণ হারাবেন; তায়েফে পাথর নিক্ষেপের ঘটনাতেও তিনি প্রতিশোধ চাননি বরং বলেছেন: بَلْ أَرْجُو أَنْ يُخْرِجَ اللهُ…—আমি আশা করি তাদের বংশ থেকে এমন লোক আসবে যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে; তিনি দুনিয়া-আখিরাতে মুমিনদের অভিভাবক—مَا مِنْ مُؤْمِنٍ إِلّا وَأَنَا أَوْلَى النّاسِ بِهِ—এবং তিনি বলেন: إِنّمَا أَنَا لَكُمْ مِثْلُ الْوَالِد—আমি তোমাদের জন্য পিতৃতুল্য; কিয়ামতের দিনও তিনি উম্মতের জন্য শাফাআতের দুআ রেখেছেন—لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ…—এটি তাঁর সীমাহীন মমতার প্রমাণ; কুরআন বলে: لَقَدْ جَآءَكُمْ رَسُوْلٌ…—তিনি তোমাদের কষ্টে ব্যথিত হন, তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অতি দয়ালু; তাই তাঁর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অপরিহার্য অংশ—لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتّى أَكُونَ أَحَبّ إِلَيْهِ…—তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে সবকিছুর চেয়ে প্রিয় হই; এই ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, বরং আনুগত্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়; ঈমানের স্বাদও এতে—ثَلَاثٌ مَنْ كُنّ فِيهِ…—যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সর্বাধিক প্রিয়; আর কিয়ামতে সে তার প্রিয়জনের সাথেই থাকবে—المَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبّ; ভালোবাসার দাবি আনুগত্য—لو كان حبك صادقا لأطعته—প্রেম সত্য হলে আনুগত্য আসবেই; দরূদ পাঠ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ—إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ…—হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর উপর দরূদ ও সালাম পাঠ কর; সাহাবায়ে কেরাম নবীপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন—তাঁদের ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়; কেউ তাঁর চুল পর্যন্ত মাটিতে পড়তে দিতেন না, কেউ নিজের জীবন ঢাল বানিয়ে তাঁকে রক্ষা করেছেন; উহুদের নারী সাহাবী বলেছিলেন: كُلّ مُصِيبَةٍ بَعْدَكَ جَلَلٌ—আপনি নিরাপদ থাকলে সব বিপদ তুচ্ছ; এইসব উদাহরণ প্রমাণ করে নবীপ্রেম কেমন হওয়া উচিত; আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের অন্তর নবীজীর ভালোবাসায় পূর্ণ করে দেন, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের তাওফীক দান করেন—আমীন; কবির ভাষায়: کوئی طلب ہے مجھے زیست میں تو اتنی ہے نبی کی چاہ ملے اور بے پناہ ملے—আমার জীবনের একমাত্র চাওয়া, নবীর ভালোবাসা অফুরন্তভাবে লাভ করা।