বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণের প্রকল্পটি শুরুতে ভারতীয় অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু ঋণ ছাড়ের জটিলতা ও কাজের ধীরগতি দেখা দেওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতীয় সহায়তা থেকে সরে আসে। শুধু এই প্রকল্পই নয়, রেলের আরও তিনটি প্রকল্পে ভারত ঋণ স্থগিত করে। ফলে নতুন অর্থায়নের উৎস খোঁজ শুরু হয়, যার ধারাবাহিকতায় এখন বগুড়া–সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পে চীনের সহায়তা আসতে যাচ্ছে। তবে সময় নষ্ট হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে সরকারের অতিরিক্ত ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। ভারত সরে দাঁড়ানোর পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এখন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে অর্থ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। চীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এইআন্তর্জাতিক ব্যাংকের সদর দপ্তর বেইজিংয়ে। দীর্ঘ সাত বছর পর নতুন অর্থায়ন হলেও কাজ শুরুর আগে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগবে। ইতিবাচক দিক হলো—পুরোনো ডিটেইলড ডিজাইন (ডিডি) ও ফিজিবিলিটি স্টাডি এআইআইবি গ্রহণ করায় এগুলো নতুন করে করার প্রয়োজন পড়বে না।তবে ব্যয় বাড়ায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের কাজ চলছে। ২০১৮ সালে একনেক প্রকল্পটির ব্যয় অনুমোদন করেছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এখন সংশোধিত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৮ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যেবাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান—প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে লোন এগ্রিমেন্টের জন্য এনওসি দেওয়া হয়েছে। ইআরডি ঋণচুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছে। আগের ব্যয় ছিল সম্ভাব্য হিসাব; ডিপিপি সংশোধনের পরই চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারিত হবে। তবে প্রাথমিকভাবে শোনা যাচ্ছে—ব্যয় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়বে।ভারতীয় এলওসি থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর ৭ সেপ্টেম্বর পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে ‘টারমিনেশন অব কন্ট্রাক্ট ফর কনভিনিয়েন্স’ নোটিশ দেওয়া হয়। এরপর বিকল্প অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিকল্পনা বিভাগ ১০ অক্টোবর পিডিপিপি পাঠায়।প্রকল্প অনুমোদনের আট বছর পর এসে ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড় হয়। গত ১৬ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ মোট ১ হাজার ৯২০ কোটি ১০ লাখ টাকা ছেড়ে দেয়। এর মধ্যে বগুড়ার জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয় ৯৬০ কোটি ১০ লাখ এবং সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসককে ৯৬০ কোটি টাকা। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন রেলপথ চালু হলে ঢাকা–বগুড়া রেলদূরত্ব কমবে প্রায় ১১২ কিলোমিটার। এতে যাত্রাসময় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে। পুরো রুটে ৮৫.৬ কিলোমিটার মূল লাইন এবং ৩৭.৪৯ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মিত হবে। করতোয়া ও ইছামতী নদীর ওপর দুটি বড় সেতু, ছোট–বড় মোট ২৫টি রেলসেতু, ৯১টি আরসিসি বক্স কালভার্ট, একটি সড়ক ওভারপাস, একটি রেল ওভারপাস এবং একটি সড়ক আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে।নতুন রেলপথে সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছোনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার ও রাণীরহাট—এই আট স্থানে নতুন স্টেশন নির্মাণ হবে। কাহালু স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবে এবং শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন সম্প্রসারণ করা হবে। এছাড়া ১০৬টি লেভেল ক্রসিং গেট এবং ১১টি স্টেশনে আধুনিক কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যালিং সিস্টেম বসবে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন—প্রকল্পটি শুরুতে কোনো অনুরোধের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি। আর ২০১৮ সালের ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত থাকলেও এখন দ্বিগুণ খরচে সেটি কতটা যৌক্তিক—সেটি নতুন করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
