বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের আর্থিক ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল অংকের বকেয়া এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।
চাহিদা বাড়ছে, প্রস্তুতি কতটা?বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। তবে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে এই চাহিদা বেড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রমজান ও সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার হলেও বাস্তবতা বেশ কঠিন।
দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে উৎপাদন নির্ভর করছে জ্বালানি সরবরাহ ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর। অতীতে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৬-১৭ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে।
৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিল না পাওয়ার অভিযোগ করছে। এই বকেয়ার ফলে নতুন করে তেল আমদানি, এলসি খোলা এবং উৎপাদন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক কোম্পানির মতে, দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না হলে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটতে পারে। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৮৮ শতাংশ গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। এর বড় অংশই আমদানি করতে হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। কয়লা ও তেল প্রায় সম্পূর্ণআমদানিনির্ভর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো জ্বালানি আমদানি স্বাভাবিক রাখতে বছরে ১৩–১৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে মোট ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। ডলারের রিজার্ভ পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি বড় চাপ তৈরি করতে পারে।কয়লা বনাম তেল: কোনটি সমাধান?বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় চালানো গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে এর জন্যও কয়লা আমদানি করতে হবে। অন্যদিকে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করা গেলেও এগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং ভর্তুকির চাপও বেশি।অনেকে মনে করেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্র সীমিত রেখে কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিক আওয়ারে তেলভিত্তিক কেন্দ্র পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।ভর্তুকির বোঝাবিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, ব্যয় কমানো এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমাধান কঠিন। সম্ভাব্য সমাধানপরিস্থিতি মোকাবেলায় কয়েকটি পদক্ষেপ বিবেচনায় আসতে পারে:ধাপে ধাপে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোতেলভিত্তিক কেন্দ্র সীমিত ব্যবহারজ্বালানি আমদানি পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাসদুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধদীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেবিনিয়োগসামনে কী?গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে সরকার আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল নিচ্ছে। তবে আর্থিক সংকট, ডলার চাপ এবং জ্বালানি আমদানির অনিশ্চয়তা মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাত এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও বাস্তবসম্মত জ্বালানি নীতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হবে।