ইরানের সামরিক ড্রোন সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। সাম্প্রতিক এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন আইনপ্রণেতাদের জানান, ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনগুলো ধারণার চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
ক্যাপিটল হিলে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, এসব ড্রোন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য উল্লেখযোগ্য হুমকি হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সব ড্রোন প্রতিহত করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।
নিচু উচ্চতায় উড্ডয়ন, শনাক্তে জটিলতা
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, শাহেদ ধরনের ড্রোন সাধারণত খুব নিচু দিয়ে এবং ধীরগতিতে উড়ে। ফলে প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এগুলো রাডারে শনাক্ত করা কঠিন হয় এবং অনেক সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ কমানোরও চেষ্টা করা হয়। কর্মকর্তারা বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার দেশগুলো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহৃত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
সম্ভাব্য যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা
ব্রিফিংয়ে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়।
একই দিনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বহু সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে এবং দেশটির নেতৃত্বের ওপর নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে।
শাসন পরিবর্তন নয়, সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসই লক্ষ্য
ব্রিফিং-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য নয়। বরং তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, নৌ সক্ষমতা, সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র সরবরাহের সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া।
ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হতে পারেন—এ প্রশ্নে কর্মকর্তারা সুস্পষ্ট কোনো ধারণা দেননি। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সাম্প্রতিক যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন বলে ট্রাম্প দাবি করেছেন। তবে তেহরান জানিয়েছে, নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে এবং তা সম্পন্ন হতে কিছু সময় লাগতে পারে।
অভিযানের সময়সীমা নিয়ে ভিন্নমত
সংঘাত কতদিন স্থায়ী হতে পারে, সে বিষয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বক্তব্যে মতভেদ দেখা গেছে। আলাবামার রিপাবলিকান সিনেটর টমি টুবারভিল বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কার্যক্রম গুটিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে মিসৌরির রিপাবলিকান সিনেটর জশ হাউলি জানান, অভিযানের নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তার ভাষায়, “এটি কবে শেষ হবে, তা স্পষ্ট নয়।”
নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিজ বলেন, সংঘাত কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কংগ্রেসের অনুমোদন ও ব্যয়ের প্রশ্ন
কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এ অভিযোগ তুলে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কিছু রিপাবলিকানও সমালোচনা করেছেন। তারা আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন।
সেনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য মার্ক কেলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার সীমাহীন নয়। ইরানের বিপুল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এই পদক্ষেপকে “যুদ্ধ” নয়, বরং একটি “গুরুত্বপূর্ণ ও সীমিত সামরিক অভিযান” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, তাৎক্ষণিক হুমকি বিবেচনায় নিয়েই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্রতর
যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হলে কংগ্রেস কী অবস্থান নেবে, সে প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ এ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই নয়, ওয়াশিংটনের রাজনীতিতেও নতুন করে বিতর্ক ও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। সংঘাতের সময়কাল, ব্যয় এবং কৌশলগত লক্ষ্য—সবকিছু নিয়েই এখনো স্পষ্টতা আসেনি।