গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনরায় সক্রিয় করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি—এমন মূল্যায়ন দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এই তথ্য প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড।
বুধবার প্রকাশিত এই তথ্যকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন, কারণ এটি ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের পক্ষে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান যুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করে আসছিল, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করছে—এ কারণেই তারা কূটনৈতিক আলোচনার পথ থেকে সরে এসে সামরিক পদক্ষেপ নেয়।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর পরিচালিত মার্কিন হামলার প্রসঙ্গে সিনেটের গোয়েন্দা কমিটিতে দেওয়া লিখিত সাক্ষ্যে গ্যাবার্ড উল্লেখ করেন, “অপারেশন মিডনাইট হ্যামার”-এর ফলে ইরানের সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, এরপর থেকে এই সক্ষমতা পুনর্গঠনের কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি তিনি টেলিভিশনে প্রচারিত উন্মুক্ত শুনানিতে উল্লেখ করেননি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো বক্তব্য তুলে ধরতে পারেননি। যদিও গোয়েন্দা সংস্থার এই মূল্যায়ন তিনি অস্বীকার করেননি।
এ নিয়ে সমালোচনা করেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার। তার অভিযোগ, ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্যগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের সংঘর্ষের পর ২০২৫ সালের জুনে চালানো ওই হামলাগুলো ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছে—এমন দাবি ট্রাম্প বারবার করে আসছেন। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি।
অন্যদিকে, তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও মনে করেন, ইরান যদি এমন কোনো পথে থেকেও থাকে, তা নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের হুমকি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম।
যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনার বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি খারিজ করেন। তার মতে, আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি—এমন বক্তব্য সঠিক নয়।
এদিকে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, আলোচনার শেষ ধাপে যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল উপস্থিত ছিলেন। তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের অবস্থান বিবেচনায় তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধে জড়ানোর মতো পরিস্থিতি তখন তৈরি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একক কোনো যুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল না। তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থের প্রতি সম্ভাব্য হুমকি, এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানের সামগ্রিক নীতির কথাও উল্লেখ করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর সামরিক হামলার বৈধতা নির্ধারণে “তাৎক্ষণিক হুমকি” একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনেও প্রেসিডেন্ট কেবল আত্মরক্ষার জরুরি পরিস্থিতিতেই সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। অন্যথায় যুদ্ধ ঘোষণা বা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান অনুমোদনের ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসের হাতে থাকে।