ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার দেশ
ত্যাগের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করেই এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই সুযোগে আবারও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। নিবন্ধন বাতিল, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি, সংগঠন নিষিদ্ধ—এত কিছুর পরও দলটির সাংগঠনিক কাঠামো অটুট থাকায় অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বিস্মিত হন। তবে রাজনীতির ময়দানে জামায়াতের এই আকস্মিক উত্থান ও প্রাথমিক জনসমর্থন যত দ্রুত এসেছিল, ততটাই দ্রুত সেই গতি কমে আসছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি ও ছাত্রশিবিরের উত্থান গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর দমন–পীড়নের সময় অনেকেই ভেবেছিলেন জামায়াত সাংগঠনিকভাবে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ৫ আগস্ট–পরবর্তী পরিস্থিতি সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। বিশ্লেষকদের মতে, দলটি দীর্ঘ সময় ধরে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স’-এর মাধ্যমে নিজেদের সংগঠন টিকিয়ে রেখেছিল। বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতিতে জামায়াতের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ছিল সবচেয়ে বড় চমক। ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র দাপটের মধ্যেও তারা গোপনে
ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল। ৫ আগস্টের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রকাশ্য উপস্থিতি অনেককেই হতবাক করে।
সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনেছাত্রশিবিরের সাফল্য প্রমাণ করে—তারা শুধু টিকে থাকেনি, বরং ভেতরে ভেতরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। ‘তৃতীয় শক্তি’ বয়ান ও অতীত পুনর্লিখনের চেষ্টা
রাজনীতিতে ফিরে এসে জামায়াত একটি নতুন বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। তাদের মূল বক্তব্য—স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে দেশ শাসন করলেও দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বাইরে যেতে পারেনি। এই যুক্তিতে জামায়াত নিজেদের ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। এই বয়ানকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তারা ২০০১–২০০৬ সালের জোট সরকারের সময়কে সামনে আনছে এবং সে সময়ের জামায়াতি মন্ত্রীদের ‘দুর্নীতিমুক্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই প্রচারণায় ১৯৭১ সালের ভূমিকা সচেতনভাবেই আড়াল করা হচ্ছে।জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান একাধিক বক্তব্যে সে সময়ের নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ বলে দাবি করেন, যা সচেতন মহলে বিতর্কের জন্ম দেয়।পিআর আন্দোলন ও দ্বিমুখী রাজনীতি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার, বিশেষ করে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির দাবিতে জামায়াত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে মাঠপর্যায়ে দলটি আগাম নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করায় অনেকেই একে রাজনৈতিক দরকষাকষির অংশ হিসেবে দেখছেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই পিআর আন্দোলনকে ‘পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতারণা’ বলে আখ্যা দেন। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ও বিতর্ক
জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মীয় আবেগকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের কোরআন ছুঁয়ে শপথ করানো, ওমরাহ করানোর প্রতিশ্রুতি কিংবা ‘জান্নাতের টিকিট’ দেওয়ার মতো বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশিষ্ট আলেম ও বিশ্লেষকদের মতে, পরকালের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুনিয়াবি ভোট আদায়ের চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ
রাজনৈতিক উত্তেজনার এক পর্যায়ে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচী–র মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা ও হুমকি দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পর মধ্যবিত্ত ও সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ, যারা আগে জামায়াতের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিল, নতুন করে আতঙ্ক ও শঙ্কা প্রকাশ করছে। বিএনপি–জামায়াত দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্রতার পর জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একাধিক ঘটনায় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য ও সাইবার প্রচারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ঢাকা–৮ আসনের এক ঘটনায় বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাস–এর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অশোভন আচরণকে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে আখ্যা দেন বিশ্লেষকরা।ইতিহাস বিতর্ক ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্ন
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কিত বক্তব্য। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার ইতিহাসবিদদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাকস্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে ইতিহাস বিকৃতির এই প্রবণতা জাতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৫ আগস্ট–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীর সামনে জনগণের আস্থা অর্জনের একটি বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উগ্র বক্তব্য, ধর্মের অপব্যবহার, ইতিহাস বিকৃতি, নারীর ক্ষমতায়নবিরোধী অবস্থান এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারহীন আচরণ দলটিকে ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র, সহনশীলতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে আপসহীন। ফলে এসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রভাব আগামী নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল—এমনটাই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জামায়াতের উত্থান ও ক্রমাবনতি: এক বিশ্লেষণ
