বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ ইরানের সীমান্তবর্তী হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়। গত মাসের শেষের দিকে তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সমন্বিত হামলা শুরুর পর ওই কৌশলগত নৌপথে তেলের প্রবাহ কার্যত বন্ধ আছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আশানুরুপভাবে বেড়ে গেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, কিছু তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন। মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এএফপি এই তথ্য জানিয়েছে। ট্রাম্প বলেন, “তেলের দাম কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে আমরা কিছু নিষেধাজ্ঞা বাতিল করছি।” তিনি আরও জানিয়েছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে কথা বলার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, “আমরা কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেগুলো বাতিল করব।” যদিও ট্রাম্প কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করেননি এবং না বললেন যে কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা কিভাবে বাতিল করা হবে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এসব দেশের মধ্যে রাশিয়ার নাম অত্যন্ত সম্ভবনাময়। কারণ রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ এবং চীন রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল আমদানিকারক।
মঙ্গলবার তেলের বাজার দিনভর ওঠা-নামা করেছে। বিশেষত, ট্রাম্প যখন বলেন, “খুব শিগগির যুদ্ধ শেষ হবে,” তখন তেল দামে এবং পুঁজিবাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। কিছু সময়ের জন্য এই ইতিবাচক বার্তার প্রভাবে দাম সামান্য কমে আসে। ট্রাম্প আরও বলেন, যুদ্ধ শেষ হলেও সেসব অনির্দিষ্ট দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আর ফিরিয়ে আনা নাও হতে পারে। তিনি বলেন, “তারপর কি হবে কে জানে? হয়তো আর সেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজন পড়বে না। বিশ্বজুড়ে আরও শান্তি বিরাজ করবে।”
এছাড়াও, ট্রাম্প অঙ্গীকার করেছেন, প্রয়োজনে তেলবাহী জাহাজগুলোকে সামরিক প্রহরা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে সাহায্য করতে আগ্রহী। তাঁর প্রশাসনের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি ওয়াশিংটনের বিবেচনায় আছে। এর একদিন আগে মার্কিন প্রশাসন সাময়িকভাবে ভারতের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার অনুমতি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর মস্কোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। এমনকি ভারতের মতো মিত্র দেশগুলো যাতে রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করতে না পারে, সে বিষয়েও ট্রাম্প প্রশাসন অগ্রগামী ভূমিকা নিয়েছে। তবে বিশেষ ব্যতিক্রম হিসেবে ভারতকে রুশ তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আপাতত চলতি বছরের ৩ এপ্রিল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারবে নয়াদিল্লি।
বিশ্লেষকের মতে, মিড-টার্ম নির্বাচনের আগে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি নাগালের বাইরে চলে যায়, তা মার্কিন ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণেই ট্রাম্প সতর্কতার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের ইরান যুদ্ধ ও ভেনেজুয়েলার নেতা মাদুরোকে উৎখাতের ঘটনা রাশিয়ার জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। কম দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা দেশগুলো এখন ওই দুই দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে, যা রাশিয়ার জন্য নতুন বাজার তৈরি করেছে।
কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার এ মাসে তাদের বিশ্লেষণী প্রবন্ধে উল্লেখ করেছে, “ওই দুই উৎস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় উপকার হয়েছে রাশিয়ার। তারা এখন চীনে তেল রপ্তানি বাড়াতে প্রস্তুত।” গবেষণা সংস্থাটি জানায়, ট্রাম্পের সামরিক অভিযান নিশ্চিত করেছে, নৌপথে চীনের কাছে তেল পৌঁছানোর সব পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে চীনের জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য তেলের উৎস হতে যাচ্ছে রাশিয়া থেকে পাইপলাইনে ও সড়কপথে তেল আমদানি।