রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী শাহ আলী মাজারে জিয়ারতকারী ও ভক্তদের ওপর হামলার ঘটনায় নয়জনকে সুনির্দিষ্ট নামীয় আসামি এবং আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে শাহ আলী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন শেখ মো. সাজ্জাদুল হক রাসেল (৩৮), মো. আজম (৪০) ও মো. আরমান দেওয়ান (২৯)। শনিবার (১৬ মে, ২০২৬) রাত সাড়ে ৯টার দিকে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়ার পর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তারা জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী বলে জানা গেছে।
হামলায় আহত রেশমি বেগম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার প্রধান নয় আসামি হলেন মো. আলী আকবর (৪৮), মো. বাপ্পা (৩৫), মো. বাবু (৪৫), মো. কাউসার (২৬), মো. আজম (৪০), শেখ মো. সাজ্জাদুল হক রাসেল (৩৮), কাজী জহির (৫২), মো. মিজান (৩৮) এবং কাজী পনির (৫০)। এজাহারে রেশমি বেগম উল্লেখ করেন, তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে শাহ আলী মাজারে জিয়ারত ও ওরস উপলক্ষে ভক্তদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সহযোগিতা করে আসছেন। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মাজার প্রাঙ্গণে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতির মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী সংগঠনের ১০০ থেকে ১৫০ জন নেতা-কর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করে আকস্মিক হামলা ও তাণ্ডব চালায়।
এজাহারে আরও বলা হয়, হামলাকারীরা মাজারের শিরনির ডেগের ঐতিহ্যবাহী লাল কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং মোমবাতি জ্বালানোর প্লেটসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষঙ্গ ভাঙচুর করে। এতে বাধা দিতে গেলে রেশমি বেগমকে মারধর করা হয় এবং তার পরনের কাপড় ছিঁড়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগও উঠে। হামলায় মাজারের প্রায় ৩০ হাজার টাকার জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি জিয়ারত করতে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৯০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে শাহ আলী মাজারে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শনিবার দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল মাজার প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করে এবং আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ভক্তদের সঙ্গে কথা বলে সংহতি প্রকাশ করে। প্রতিনিধিদলে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক, প্রীতম দাশ, হুমায়রা নূরসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রতিনিধিদলটি শাহ আলী থানার ওসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।
মাজার পরিদর্শন শেষে সারোয়ার তুষার বলেন, গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন মাজার ও সুফি স্থাপনায় ধারাবাহিকভাবে পরিকল্পিত হামলা চালানো হচ্ছে। কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরসহ বিভিন্ন মাজারে হামলার ঘটনায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট হলেও ‘মব’ শব্দ ব্যবহার করে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দায় এড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি গত দুই বছরে দেশের সব মাজারে সংঘটিত হামলার ঘটনা তদন্তে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠনের জোর দাবি জানান।