সুফিবাদ বা তাসাওউফ হলো আধ্যাত্মিকতা চর্চার মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধির এক ইসলামি দর্শন। আত্মার পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। এই সম্পর্কের মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর মধ্যে বিলীন হওয়া) সম্ভব হয়, যা শেষে বাকাবিল্লাহ (স্থায়ীভাবে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়া) অর্জনে পরিণত হয়। যেহেতু আল্লাহ অনাকৃত, তাই তাঁর মধ্যে ফানা হওয়া শুধুমাত্র হৃদয়ে আল্লাহর প্রেমের মাধ্যমে সম্ভব। তাসাওউফে এইসাধনাকে‘তরিকত’ বা আল্লাহর নিকটতম পথ বলা হয়।তরিকতের সাধনায় মুর্শিদের সহায়তা প্রয়োজন। এই পথের প্রধান ধাপগুলো হলো ফানা ফিশশাইখ (শিক্ষক বা পীরের কাছে বিলীন হওয়া), ফানা ফিররাসুল (রাসূলের আদর্শে বিলীন হওয়া) এবং ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ লাভের পর বাকাবিল্লাহ অর্জিত হয়।সুফিবাদের মূল বিষয় হলো আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর স্মরণ ও প্রেম অর্জন। ‘সুফ’ শব্দের অর্থ পশম, আর তাসাওউফের অর্থ হলো ‘পশমের লেবাস পরার অভ্যাস’ (লাবসুস-সুফ)। এই আধ্যাত্মিক সাধনায় জীবন উৎসর্গ করা ব্যক্তিকে সুফি বলা হয়। যখন কেউ বাকাবিল্লাহ অর্জন করেন, তখন তিনি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে সুদৃঢ় হয়ে যান এবং তার অন্তরে শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে।হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “মানবদেহে একটি অঙ্গ আছে, যা সুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ পরিশুদ্ধ থাকে, আর অসুস্থ হলে সমগ্র দেহ অপরিশুদ্ধ হয়। এটি হলো হৃদয় বা কলব। আল্লাহর স্মরণে কলব পরিশুদ্ধ হয়।” সুফিবাদের মূল লক্ষ্য হলো সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকর দ্বারা হৃদয়কে কলুষমুক্ত করা এবং আল্লাহর প্রেম অর্জন করা।সুফিবাদ পারস্যে বিশেষভাবে বিকশিত হয়। সেখানে প্রখ্যাত সুফি, দরবেশ, কবি ও দার্শনিকরা বিভিন্ন শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে তাসাওউফকে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিখ্যাত অলিদের চারপাশে বিভিন্ন তরিকা গড়ে ওঠে।চারটি প্রধান তরিকা সবচেয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করে:১. বড় পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (র.) প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা২. হজরত খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতি (র.) প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা৩. হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (র.) প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা৪. হজরত শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে ছানী সারহিন্দী (র.) প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকাএর পাশাপাশি সুহরাওয়ার্দি, মাদারিয়া, আহমদিয়া ও কলন্দরিয়া তরিকার উদ্ভব ঘটে।সুফিবাদ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আরব, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান,খোরাসান, মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে সুফিরা বাংলাদেশে এসে এই দর্শন প্রচার করেন। খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে যারা ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: শাহ সুলতান রুমি (র.), বাবা আদম শহিদ (র.), শাহ সুলতান বলখি (র.), শাহ নিয়ামতুল্লাহ বুতশেকন (র.), শাহ মখদুম রুপেশ (র.), শেখ ফরিদউদ্দিন শক্করগঞ্জ (র.), মখদুম শাহ দৌলা শহিদ (র.)। এঁরা গভীর জ্ঞানী ও বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।কিছু সুফি-দরবেশ ইসলাম ও সুফিবাদ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের মধ্যেউল্লেখযোগ্য: শেখ জালালুদ্দিন তাব্রিজি (র.), শাহ জালাল (র.), শেখ আলাউল হক (র.), খান জাহান আলী (র.), শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (র.), শাহ ফরিদউদ্দিন (র.)।সুফিরা মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সৃষ্টির প্রতি প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রেম অর্জনের পথ দেখান। তাঁদের আদর্শ জীবন, প্রেম-ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যবোধ প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব হয়েছে। সাধারণ জীবনেও সুফিদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়—নদী বা সমুদ্রপথে মাঝিরা ‘বদর পীরের’ নাম স্মরণ করে, শহরের যানবাহনে পীর ও আউলিয়ার নাম লেখা থাকে। মুর্শিদি-মারফতি গান, গাজি কাব্য, মাগনের গান ও অন্যান্য সাহিত্য পীর-দরবেশ কেন্দ্রিক রচিত হয়েছে।
“সুফিবাদ: আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে মিলনের পথ”
Sign Up For Daily Newsletter
Be keep up! Get the latest breaking news delivered straight to your inbox.
[mc4wp_form]
By signing up, you agree to our Terms of Use and acknowledge the data practices in our Privacy Policy. You may unsubscribe at any time.
Create an Amazing Newspaper
Discover thousands of options, easy to customize layouts, one-click to import demo and much more.
Learn More