মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি আরবকে ঘিরে এক বড় সামরিক ঘটনার খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতা ও পর্দার আড়ালের আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক হামলার নির্দেশ দেন। এ তথ্য চারজন সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলা হলেও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগত পর্যায়ে একাধিকবার ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে মত দেন। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে তার দেশের জন্য বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে আসছিলেন এবং মার্কিন সামরিক সহায়তার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন।
এই সমন্বিত চাপের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক কাঠামোকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। প্রাথমিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
অন্যদিকে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে উল্লেখ ছিল, অন্তত আগামী এক দশকে ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক আক্রমণের সম্ভাবনা খুব কম। তবুও এই অভিযান পরিচালিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার একটি দেশের শাসনব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে এমন বড় আকারের সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে চলেছিল। এ সিদ্ধান্তকে অনেকেই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
এই হামলার সময় মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন। আলোচনার মধ্যেই সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় সৌদি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলে—এখন ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
সৌদি আরবের অবস্থান ছিল দ্বিমুখী চাপে আবদ্ধ। একদিকে তারা নিজেদের তেল স্থাপনাগুলোকে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা থেকে রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তেহরানের প্রভাব কমাতেও আগ্রহী। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান ও সুন্নি নেতৃত্বাধীন সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, যা প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি সংঘাতের রূপ নেয়।
মার্কিন হামলার পর ইরান সৌদি আরবের ওপর পাল্টা আঘাত হানে বলে জানা যায়। জবাবে রিয়াদ কঠোর ভাষায় বিবৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।
মার্কিন প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, জেনেভায় ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পরও আলোচনায় অগ্রগতি হয়নি বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে ইরান সময়ক্ষেপণ করছে—এমন অভিযোগ ওঠে। এর পরপরই ট্রাম্পের বক্তব্যে কঠোরতা বাড়তে থাকে।
হামলার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় ট্রাম্প ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব ও তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা এবং ২০০০ সালে ইয়েমেনে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে আক্রমণের ঘটনাও উল্লেখ করেন। তার দাবি ছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ও মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের কিছু তথ্য এ দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মিল খায় না। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক বোমা তৈরির সুস্পষ্ট প্রমাণ তাদের হাতে নেই। একইভাবে মার্কিন ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির আগের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছে—এমন নিশ্চিত তথ্য নেই।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, পরবর্তী পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা গড়ে তুলবে—এমনটাই তিনি প্রত্যাশা করেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে সামরিক অভিযান আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এখন বৈশ্বিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজরে। ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহ অনেকাংশে নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরবর্তী কৌশল, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর।