মানবজীবনের প্রতিটি সম্পর্কেই সর্বোচ্চ আদর্শ স্থাপন করেছেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)। পিতা, নেতা, বন্ধু—সব পরিচয়ের পাশাপাশি স্বামী হিসেবে তাঁর জীবন ছিল অতুলনীয় দয়া, সৌজন্য ওদায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি কখনো পরিবারের ওপর রাগ, জুলুম বা অবহেলার বোঝা চাপিয়েদেননি;বরংভালোবাসা, ধৈর্য ও কোমল আচরণের মাধ্যমে সংসারকে করেছেন শান্তিময় ও দৃঢ়।আজকের সমাজে বহু সংসার অশান্ত হয়ে উঠছে স্বামীদের ভুল আচরণ, রাগ ও অসহিষ্ণুতার কারণে। এই বাস্তবতায় নবীজি (ﷺ)–এর দাম্পত্য জীবন আমাদের জন্য সময়োপযোগী শিক্ষা ও পথনির্দেশনা।
স্ত্রীদের সঙ্গে কোমল ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ নবীজি (ﷺ) সবসময় স্ত্রীদের সঙ্গে নরম ভাষায়, সম্মানের সাথে কথা বলতেন। কঠোরতা বা অপমান তাঁর চরিত্রে ছিল না। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে উত্তম।”(তিরমিজি, দারিমি)
এ হাদিস প্রমাণ করে—মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় ঘরের ভেতরের আচরণে, বাহ্যিক আড়ম্বরের মধ্যে নয়।
ঘরোয়া কাজে অংশগ্রহণ: মর্যাদার প্রকৃত পরিচয়
নবীজি (ﷺ)–এর জীবন ছিল অত্যন্ত সরল। তিনি নিজের কাজ নিজেই করতেন।হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন—নবীজি (ﷺ) ঘর পরিষ্কার করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন, নিজের জুতা ও কাপড় সেলাই করতেন।
এমনকি তিনি শুধু নিজের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; স্ত্রীদের ঘরের কাজে সাহায্য করতেন। নামাজের সময় হলে তিনি কাজে বিরতি দিয়ে ইবাদতে দাঁড়িয়ে যেতেন।
আজ অনেকেই মনে করেন, ঘরের কাজে সহায়তা করা পুরুষের মর্যাদার পরিপন্থী। অথচ নবীজি (ﷺ) আমাদের শিখিয়েছেন—পরিবারের কাজে সহযোগিতা করাই প্রকৃত সম্মান। দাম্পত্য জীবনে আনন্দ ও বন্ধুত্ব নবীজি (ﷺ) দাম্পত্য সম্পর্ককে কখনো শুষ্ক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ করেননি।
তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে গল্প করতেন, হাসি–ঠাট্টা করতেন, একসাথে খাবার খেতেন, এমনকি দৌড় প্রতিযোগিতাও করতেন।হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন—একবার তিনি নবীজির সাথে দৌড়ে এগিয়ে যান, আবার পরে নবীজি (ﷺ) জিতে বলেন—“আজকেরটি আগেরটির বদলা।”
এ থেকে বোঝা যায়—সুখী দাম্পত্য মানে কেবল দায়িত্ব নয়; ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও আনন্দের মিলন। কষ্টে সান্ত্বনা ও মানসিক সহমর্মিতা নবীজি (ﷺ) স্ত্রীদের অনুভূতির প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল। একবার তাঁর এক স্ত্রীকে বংশ নিয়ে কটাক্ষ করা হলে তিনি কাঁদতে থাকেন। নবীজি (ﷺ) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন— তুমি একজন নবীর কন্যা, নবীর বংশধর এবং একজন নবীর স্ত্রী—তোমার মতো সম্মানিতা নারী আর কে আছে?এভাবেই তিনি স্ত্রীদের আত্মসম্মান রক্ষা করেছেন, তাদের মনকে শক্ত করেছেন। খাবারের বিষয়ে ধৈর্য ও সৌজন্য
নবীজি (ﷺ) কখনো খাবারে দোষ খুঁজতেন না।
খাবার পছন্দ হলে খেতেন, ভালো না লাগলে নীরবে রেখে দিতেন—কিন্তু কখনো অভিযোগ করতেন না।
আজ যারা খাবার টেবিলে বসেই দোষ খোঁজেন, তাদের জন্য এটি এক উজ্জ্বল আদর্শ। সহিংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নবীজি (ﷺ) কখনো স্ত্রীদের ওপর হাত
তোলেননি, গালি দেননি, অপমান করেননি।তিনি বলেছেন—“তোমরা আল্লাহর দাসীদের প্রহার করো না।”আজকের সমাজে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন একটি ভয়াবহ সমস্যা। নবীজি (ﷺ)–এর জীবন আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয়—যে জুলুম করে, সে কখনো উত্তম স্বামী হতে পারে না। আমাদের জন্য শিক্ষা নবীজি (ﷺ) দেখিয়ে গেছেন—
একজন স্বামীর প্রকৃত শক্তি তার রাগে নয়, বরংতার কোমলতা, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসায়।আজ যদি আমরা তাঁর দাম্পত্য আদর্শ অনুসরণ করি, তবে—সংসার হবে শান্তিময় সম্পর্ক হবে দৃঢ় পরিবার হবে সুখী সমাজ হবে সুস্থ। দোয়া আল্লাহ তাআলা আমাদের দাম্পত্য জীবনকে শান্তি ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিন। নবীজি (ﷺ)–এর আদর্শ অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন।
আমিন।