বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক মানবিক সংকট মোকাবিলায় হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বিশেষ কারিগরি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
শুক্রবার প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক জানান, অঞ্চলের উত্তেজনা বাড়তে থাকায় হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক বাণিজ্য বিঘ্নিত হলে তা বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি উৎপাদনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাতের একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও, তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। নতুন এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সার ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা, যাতে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। জাতিসংঘের মতে, উদ্যোগটি সফল হলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাধানের পথ সুগম হবে।
এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল হোর্হে মোরেইরা দা সিলভা। এতে অংশ নিচ্ছে ইউএন কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (UNCTAD), ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) এবং ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (ICC)-এর প্রতিনিধিরা। প্রয়োজনে আরও সংস্থাকে যুক্ত করা হতে পারে।
একই সঙ্গে মহাসচিবের ব্যক্তিগত দূত জঁ আর্নল্ট এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন।
দা সিলভার ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্ভাব্য মানবিক সংকট প্রতিরোধে সার ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বহনকারী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
এদিকে, ইরান এই মানবিক উদ্যোগে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। নিউইয়র্কে নিযুক্ত দেশটির প্রতিনিধি আলী বাহরেনি জানিয়েছেন, মানবিক সহায়তা পরিবহনের নিরাপত্তা জোরদারে জাতিসংঘের অনুরোধে তেহরান ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের আগে এটি ছিল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। তবে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইরান কার্যত এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।
ইরান জানিয়েছে, যেসব জাহাজ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, সেগুলোর জন্য প্রণালী আংশিকভাবে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ কয়েকটি ‘বন্ধুসুলভ’ দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
তবে তেহরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ছয়টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
সূত্র:আনাদোলু এজেন্সি