মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভূগর্ভস্থ মিসাইল বাঙ্কার ও সাইলো (মিসাইল সংরক্ষণাগার) দ্রুত পুনরুদ্ধারে নেমেছে ইরান। হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানি কর্মীরা মাটি খুঁড়ে এসব স্থাপনা পুনরায় সচল করে তুলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, ইরানের হাতে এখনো বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার মজুত রয়েছে। যদিও চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন দাবি করেছে, পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানের প্রায় ১১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে এবং এতে বড় ধরনের সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়। তাদের মতে, ইরানের মিসাইল সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। বর্তমানে ইরানের হাতে থাকা মিসাইল ও লঞ্চার দিয়ে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর সক্ষমতা এখনও বজায় রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও একাধিকবার বলেছেন, ইরানের মিসাইল সক্ষমতা ধ্বংস করাই এই যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য। একইসঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি কিছুটা সুর নরম করে বলেন, “ইরান এখনও কিছু মিসাইল নিক্ষেপ করতে পারে, তবে আমরা সেগুলো আকাশেই প্রতিহত করব।”
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলা প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। তাদের মতে, ইরানের নৌবাহিনী কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে এবং ইরানের আকাশে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে গোয়েন্দা বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাদের ধারণা, হামলা কমে যাওয়ার পেছনে কৌশলগত কারণ রয়েছে। ইরান তাদের অধিকাংশ মিসাইল লঞ্চার পাহাড়ি গুহা ও ভূগর্ভস্থ গোপন বাঙ্কারে সরিয়ে ফেলেছে, যাতে শত্রুর হামলা এড়ানো যায় এবং প্রয়োজনমতো পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান এখনো তাদের মিসাইল সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করছে—একদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে চাপ বজায় রাখা, অন্যদিকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রভাব ধরে রাখা।
অস্ত্র ব্যবহারে কিছুটা সংযম দেখালেও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো বন্ধ করেনি তেহরান। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইসরায়েলের দিকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০টি মিসাইল নিক্ষেপ করা হচ্ছে, কখনো একাধিক ছোট আকারে হামলা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে এক পশ্চিমা কর্মকর্তার দাবি, প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ৫০ থেকে ১০০টি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক’ ড্রোন ব্যবহার করছে ইরান।
ইরানের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য ইরান বিপুল পরিমাণ ভুয়া বা ছদ্মবেশী লঞ্চার ব্যবহার করছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্র যেসব লঞ্চার ধ্বংসের দাবি করছে, তার মধ্যে কতগুলো আসল তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এছাড়া যুদ্ধের আগে ইরানের হাতে মোট কতসংখ্যক লঞ্চার ছিল, তার নির্ভুল তথ্যও ওয়াশিংটনের কাছে নেই। ফলে বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙ্কার বা গুহাগুলোতে ঠিক কত লঞ্চার অবশিষ্ট রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাহ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মনে হলেও অনেক বাঙ্কার, সাইলো ও গুহা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। ইরান দ্রুত মাটি খুঁড়ে সেগুলো পুনরুদ্ধার করে আবারও ব্যবহারে সক্ষম হচ্ছে।
এর আগে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানের প্রায় অর্ধেক মিসাইল লঞ্চার এখনো অক্ষত রয়েছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণেও সেই ইঙ্গিতই মিলছে, যদিও নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরান বুলডোজার ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে চাপা পড়া লঞ্চারগুলো দ্রুত উদ্ধার করছে এবং পুনরায় সক্রিয় করছে।