২০২৫ সাল ছিল বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক অস্থির ও ঘটনাবহুল অধ্যায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি—সব মিলিয়ে বছরটি মানবসভ্যতার সামনে একাধিক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্বকে যেমন বিভক্ত করেছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সবুজ শক্তির অগ্রগতি কিছু আশার আলোও দেখিয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার প্রত্যাবর্তন ও বিতর্কবছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক নাটকীয়তা দেখা যায়। ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই তিনি একাধিক নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এর মধ্যে জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়া, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি বাতিল এবং অভিবাসন নীতি কঠোর করার সিদ্ধান্ত ছিল উল্লেখযোগ্য। চীনসহ বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়ারাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৫ সালে চতুর্থ বছরে পা রাখে। যুদ্ধের তীব্রতা কমেনি, বরং সামরিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও স্থায়ী সমাধানের কোনো পথ তখনও স্পষ্ট হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বছরের শুরুতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মার্চে পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হলে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ আরও গভীর হয় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ভ্যাটিকানে ঐতিহাসিক পরিবর্তন২১ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়, যখন পোপ ফ্রান্সিস মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর ক্যাথলিক চার্চের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন আমেরিকান নাগরিক নতুন পোপ হিসেবে নির্বাচিত হন, যিনি ‘পোপ লিও চতুর্দশ’ নামে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা
এপ্রিলে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র হামলায় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এর জেরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা চরমে ওঠে। সীমান্ত সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি অভিযানের পর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে, যদিও পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।দুর্ঘটনা ও গণআন্দোলনজুন মাসে ভারতে একটি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমানের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রায় সব যাত্রীর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে শোকের সৃষ্টি করে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ আন্দোলনে রূপ নেয়।মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ ও যুদ্ধবিরতি
জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হয়, যা কয়েকদিনের তীব্র লড়াইয়ের পর যুদ্ধবিরতিতে গিয়ে থামে। এতে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
রাজনৈতিক সংকট ও সরকার পতনথাইল্যান্ডে সীমান্ত উত্তেজনা ও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির জেরে সরকার সাংবিধানিক সংকটে পড়ে। আদালতের রায়ে প্রধানমন্ত্রী পদচ্যুত হন এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একই ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলন ইউক্রেন ও নেপালেও দেখা যায়, যেখানে তরুণদের নেতৃত্বে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়।আন্তর্জাতিক সহিংসতা ও আলোচিত ঘটনাসেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে এক রাজনৈতিক বিতর্ক অনুষ্ঠানে ডানপন্থী এক অ্যাক্টিভিস্ট নিহত হন, যা রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করে। একই মাসে কাতারের দোহায় বিমান হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। গাজা যুদ্ধবিরতি ও আফ্রিকার সংকটঅক্টোবরে গাজা ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দীর্ঘ সংঘাতের অবসানের পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়। একই সময়ে সুদানে গৃহযুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নেয়, যেখানে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বিতর্কপ্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরে দিনের আলোতে ডাকাতির ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। অন্যদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা যায়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মতভেদের প্রতিফলন ঘটায়।বছরের শেষভাগ
ডিসেম্বরে থাইল্যান্ডে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা আসে। একই সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলে। মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করা হয়। ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা যোগ করে।এ ছাড়া বছরের শেষভাগে জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ায় বৈশ্বিক কূটনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।শেষ কথা২০২৫ সাল প্রমাণ করেছে—বিশ্ব যত আধুনিক ও সংযুক্ত হচ্ছে, অনিশ্চয়তা ও ভঙ্গুরতাও তত বাড়ছে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত ও মানবিক সংকট মানুষের জীবনকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেললেও প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য শক্তি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য কিছু আশার দিগন্তও খুলে দিয়েছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে—আগামী দশকে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতির পথে এগোবে, নাকি বিভাজনের ভার আরও বাড়বে।