চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ একসময় পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের মাঝেঅবস্থিত এই দ্বীপকে প্রায় এক দশক শাসন করেছিলেন পর্তুগিজ জলদস্যু সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ। জোয়াকিম জোসেফ এ ক্যাম্পোসের ‘হিস্ট্রি অব দ্য পর্তুগিজ ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থে তিবাউর উত্থান নিয়ে একটি অধ্যায় রয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে, তিবাউ অখ্যাত একটি পর্তুগিজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৬০৫ সালে ভারতবর্ষে আসেন। প্রথমে তিনি গোয়ায় সৈনিক হিসেবে কাজ শুরু করলেও, পরে তা ছেড়ে বণিকের জীবন বেছে নেন। একটি জাহাজ কিনে লবণের ব্যবসা শুরু করেন। ১৬০৭ সালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের দেয়াং এলাকায় তিনি বড় বিপদের মুখোমুখি হন। তখন ওই এলাকা আরাকানের অংশ ছিল। আরাকান রাজার নির্দেশে পর্তুগিজদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল, বহু পর্তুগিজ প্রাণ হারালেও তিবাউ বেঁচে যান। তিনি এবং বেঁচে যাওয়া কয়েকজন পর্তুগিজ গঙ্গার মোহনায় বসতি স্থাপন করে জলদস্যুতার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। তারা আরাকান উপকূল ও বন্দরগুলোতে লুটপাট চালাতেন এবং তৎকালীন বকলার (বরিশাল) বন্দরে বিক্রি করতেন। সন্দ্বীপে পর্তুগিজদের আগ্রাসন ছিল আগেরও। পূর্বে ‘ডমিঙ্গো কারভালহো’ ও ‘ম্যানোয়েল দা মাত্তোস’ দ্বীপটি শাসন করেছিলেন। ১৬০৫ সালে কারভালহোর মৃত্যু হয়। মাত্তোসের মৃত্যুর পর দ্বীপের দায়িত্ব পেরো গোমেজের হাতে আসে। তবে তিনি অদক্ষ প্রশাসক ছিলেন, যার সুযোগে দ্বীপে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। তখন ফতেহ খান দ্বীপ দখল করে নিজেকে শাসক ঘোষণা করেন। ১৬০৯ সালে তিবাউ ফতেহ খানের বাহিনীকে পরাজিত করে সন্দ্বীপের দখল নেন।ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়, তিবাউর দল ছিল কম শক্তিশালী হলেও নৌ চালনার দক্ষতায় জয়ী হয়। তিবাউর পাশে ছিলেন বকলার রাজা প্রতাপাদিত্য, যিনি ২০০ অশ্বারোহী ও যুদ্ধজাহাজ দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। দ্বীপ দখলের পর তিবাউর দল আরাকানি জাহাজে লুটপাট শুরু করে এবং মালামাল বকলারের বন্দরে বিক্রি করা হতো। প্রথমে তিবাউ প্রতাপাদিত্যকে দ্বীপের রাজস্বের অর্ধেক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে তা রাখেননি। বরং তিনি দক্ষিণ শাহবাজপুর (ভোলা) দখল করেন। তিবাউর বাহিনী তখন এক হাজারের বেশি পর্তুগিজ, দুই হাজার স্থানীয় সৈন্য, ২০০ অশ্বারোহী এবং শক্তিশালী নৌবহর নিয়ে গঠিত ছিল।তিবাউ স্বাধীন শাসক হিসেবে দ্বীপ পরিচালনা করতেন, গোয়ার প্রাতিষ্ঠানিক পর্তুগিজ শাসন ‘এস্তাদো দা ইন্ডিয়ার’ অধীনে থাকতেন না। ১৬১৫ সালে তিনি আরাকানের রাজধানী ম্রাউক ইউ আক্রমণ করেন, যদিও পরবর্তীতে ডাচদের সহায়তায় পরাজিত হন।
সন্দ্বীপে তিবাউর শাসন অব্যাহত থাকে ১৬১৭ সাল পর্যন্ত। পরে আরাকান রাজা মিন খামাউং তাকে পরাজিত করেন।সেই সময়ে দ্বীপটি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সন্দ্বীপ লবণ উৎপাদনের জন্য খ্যাত, যা অন্যান্য অঞ্চলে রপ্তানি হতো। এছাড়া চাল, শস্য ও সুতির কাপড় উৎপাদনের জন্যও পরিচিত ছিল দ্বীপটি। নৌযান মেরামতের কেন্দ্র হিসেবে দ্বীপটির গুরুত্বও অনেক ছিল।
পর্তুগিজ জলদস্যু তিবাউর যেভাবে হয়েছিলেন সন্দ্বীপের রাজা
