ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে চাপ বাড়াচ্ছে মূলত বিশাল তেল সম্পদের ওপর দখল নিতে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করেছে। অভিযোগ করা হয়, এতে ভেনেজুয়েলার তেল বহন করা হচ্ছিল, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছে। এরপর হোয়াইট হাউস সতর্ক করেছে, যদি ভেনেজুয়েলার তেল বহন করা হয়, তবে অন্য জাহাজের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে ভেনেজুয়েলার কিছু নৌকাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও মাদুরোকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ভেনেজুয়েলা থেকে মাদক ও অপরাধী পাঠানোর অভিযোগ তুলেছেন
ভেনেজুয়েলার তেলের পরিমাণ এবং উৎপাদনভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ভাণ্ডারের মালিক। দেশটির মাটির নিচে আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে। তবে উৎপাদন ক্ষমতা ভাণ্ডারের তুলনায় অনেক কম। ২০০০ সালের পর থেকে উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। হুগো শাভেজ এবং পরবর্তীতে নিকোলাস মাদুরো রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। এতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অনেকেই চাকরি ছেড়ে চলে যান। মার্কিন কোম্পানি শেভরন এখনও ভেনেজুয়েলায় কাজ করছে, তবে অন্যান্য পশ্চিমা কোম্পানির কার্যক্রম অনেকাংশে সীমিত। এর মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ধাপে ধাপে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় তা আরও কঠোর হয়। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় শূন্যে নেমে আসে এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি আমদানি করা কঠিন হয়ে যায়। ইনভেস্টেকের কমোডিটি প্রধান ক্যালাম ম্যাকফারসন বলেন, ভেনেজুয়েলার তেলের উৎপাদনের মূল সমস্যা তাদের পুরনো ও ভগ্নদশা অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে ভেনেজুয়েলা দৈনিক মাত্র ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে। এটি এক দশক আগের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম এবং বিশ্বব্যাপী চাহিদার তুলনায় ১ শতাংশেরও নিচে। যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্য কী?
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ধারণা আছে, ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপ করলে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের নতুন সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। মার্কিন কংগ্রেসের ফ্লোরিডার রিপাবলিকান নেত্রী মারিয়া এলভিরা সালাজার বলেন, ভেনেজুয়েলা হতে পারে আমেরিকান তেল কোম্পানির জন্য এক ‘স্বর্ণখনি’। দেশটিতে গেলে তারা নষ্ট পাইপলাইন, রিগ এবং অবকাঠামো মেরামত করতে পারবে। ট্রাম্পের প্রচার স্লোগান ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ ইঙ্গিত দেয় যে তিনি তেল উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ মূলত মাদক পাচার এবং মাদুরোর অবৈধ শাসন নিয়ে। থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্লেটন সিগল মনে করেন, ঘোষিত উদ্দেশ্যই নীতি হিসেবে নেওয়া যায়, এবং তেল-নিয়ে আগ্রহের সরাসরি প্রমাণ এখনও নেই।চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যত
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম কমাতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বর্তমান উৎপাদন সীমিত হওয়ায় তা বড় প্রভাব ফেলবে না। তেল শিল্পকে পুনরায় শক্তিশালী করা সহজ নয়। উড ম্যাকেঞ্জির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও কিছু বিনিয়োগ করা হলে আগামী দুই বছরে উৎপাদন দিনে প্রায় ২ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। তবে পূর্ণ উৎপাদনের জন্য কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। ভেনেজুয়েলা ওপেকের সদস্য, যা উৎপাদন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগকে আরও জটিল করে। এছাড়া তেলের ভবিষ্যৎ চাহিদা কমে আসছে, ফলে বিনিয়োগকারীরা আগে বিবেচনা করবে, এটি তাদের জন্য লাভজনক হবে কি না। বর্তমানে শেভরন ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে সক্রিয় বিদেশি কোম্পানি। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে এই কোম্পানি দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবে। তবে অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনও সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য মাদুরো সরকারের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কমানো।
“ভেনেজুয়েলার তেল বনাম মার্কিন নীতি: ট্রাম্প কি সত্যিই তেলের জন্য আগ্রহী?”
