পবিত্র মসজিদে নববী-তে প্রিয় নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ)-এর রওজা মুবারকের সাথে সংযুক্ত একটি বিশেষ পিলার রয়েছে, যা ইতিহাসে আবু লুবাবার পিলার নামে পরিচিত। সে সময় মদিনায় বনু কুরাইযা নামে একটি ইয়াহুদি গোত্র বসবাস করত। তারা একাধিকবার প্রিয় নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ)-এর সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের শাস্তির জন্য রাসূলে পাক (ﷺ) তাদের দুর্গ চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করেন এবং আল্লাহর নির্ধারিত বিচারের ওপর আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেন।অবরোধ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠলে বনু কুরাইযা পক্ষ থেকে লোক পাঠানো হয় এই মর্মে যে, তারা এ বিষয়ে সাহাবি আবু লুবাবা (রাঃ)-এর সঙ্গে পরামর্শ করতে চায়। জাহিলি যুগে তাদের সঙ্গে আবু লুবাবা (রাঃ)-এর সুসম্পর্ক থাকায় তারা তাঁকেই বেছে নেয়। ইসলামী বিধান অনুযায়ী তাদের পুরুষ যোদ্ধাদের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্তনির্ধারিতহয়েছিল, তবে তারা তখনও বিষয়টি জানত না।আবু লুবাবা (রাঃ) সেখানে উপস্থিত হলে নারী ও শিশুরা তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তখন গোত্রের পুরুষরা তাঁকে প্রশ্ন করে— তারা কি মুহাম্মদ (ﷺ)-এর বিচারের ওপর আত্মসমর্পণ করবে? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যাঁ, আত্মসমর্পণ করাই উত্তম। কিন্তু অনিচ্ছাকৃতভাবে তিনি গলার দিকে ইশারা করে বোঝান যে, তাদের পরিণতি কঠোর হতে পারে। মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর উপলব্ধি হয়— এ ইশারার মাধ্যমে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর আমানতের ব্যাপারে বড় ধরনের খেয়ানত করে ফেলেছেন।
নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি গভীর লজ্জাওঅনুশোচনায় ডুবে যান এবং মনে মনে ভাবতে থাকেন— এখন কীভাবে আল্লাহর অসন্তোষ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব?এরপর তিনি দয়াল নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ)-এর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ না করে সেখান থেকেই দ্রুত মসজিদে নববীতে চলে যান এবং একটি পিলারের সঙ্গে নিজেকে শক্তভাবে বেঁধে ফেলেন। সে সময় মসজিদের পিলারগুলো খেজুর গাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি ছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন,“আল্লাহর কসম! আল্লাহ তায়ালা আমার তাওবা কবুল না করা পর্যন্ত আমি নিজেকে মুক্ত করব না।”
প্রিয় নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ) তাঁর এই অবস্থার কথা জানতে পেরে বলেন— “সে যদি আমার কাছে আসত, আমি অবশ্যই তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। কিন্তু যেহেতু সে নিজেই এই দায়িত্ব নিয়েছে, আল্লাহ যতক্ষণ তার তাওবা কবুল না করবেন, ততক্ষণ আমি তাকে মুক্ত করব না।” এইভাবে কয়েকদিন বাঁধা অবস্থায় থাকার কারণে আবু লুবাবা (রাঃ) অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তাঁর শক্তি ক্ষীণ হয়ে যায়, শ্রবণশক্তি কমে আসে এবং দৃষ্টিশক্তিও ঝাপসা হতে থাকে। এ দৃশ্য দেখে তাঁর সন্তানরা পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ত। নামাজের সময় তাঁর স্ত্রী তাঁকে খুলে দিতেন এবং নামাজ শেষে তিনি আবার নিজেকে বেঁধে নিতেন। এভাবে তিনি টানা ছয় দিন অতিবাহিত করেন। অবশেষে সপ্তম দিনের শেষ রাতে তাঁর তাওবা কবুলের আয়াত নাজিল হয়। সে সময় দয়াল নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ) ছিলেন তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা (রাঃ)-এর ঘরে। তিনি দেখেন, প্রিয় নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ) এই অবস্থা দেখে হাসছেন । কারণ জিজ্ঞাসা করলে রাসূল (ﷺ) বলেন— “আল্লাহ তায়ালা আবু লুবাবার তাওবা কবুল করেছেন।” উম্মে সালামা (রাঃ) অনুমতি নিয়ে তাঁকে সুসংবাদ দিলে মানুষ তাঁকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু তিনি বলেন—“আল্লাহর কসম! দয়াল নবীজি রাসূলে (ﷺ) নিজ হাতে মুক্ত না করা পর্যন্ত আমি মুক্ত হব না।”পরবর্তীতে প্রিয় নবীজি রাসূলে পাক (ﷺ)নামাজের জন্য হয়ে নিজ হাতে তাঁকে মুক্ত করে দেন। আজও মসজিদে নববীতে গেলে এই পিলারটি দেখা যায়। লাল চিহ্নিত সবুজ গোল অংশে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে—اُسْطُوانَةُ أَبِي لُبَابَةَঅর্থাৎ আবু লুবাবার পিলার।এ ঘটনা আমাদের শেখায়— খাঁটি তাওবা কতটা মহান। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও আল্লাহ এই স্থানটিকে চিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছেন, যেন মানুষ তাওবার গুরুত্ব উপলব্ধি করে, ঈমানকে নতুন করে জাগ্রত করে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে অনুপ্রাণিত হয়।
চলমান…
উস্তুওয়ানা আবু লুবাবা (রাঃ) তাওবার এক অনন্য নিদর্শন
