বর্তমান সময়ে বছরে গড়ে ৫০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ৫২,৭৯৯ জন শিক্ষার্থী ৫৫টি দেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য দেশত্যাগ করেছে। শিক্ষার্থীরা প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে বিদেশে শিক্ষার্থী যাওয়ার সংখ্যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে বিদেশে গিয়েছিলেন ৪৯,১৫১ জন শিক্ষার্থী, ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৪,৩৩৮। ২০১৩ সালে মাত্র ২৪,১১২ জন শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়েছিলেন, যা ২০২৩ সালে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওপেন ডোরসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে ২০,১৫৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য গেছে। দেশটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশ নবম অবস্থানে রয়েছে।
কিছু কনসালটেন্সি ফার্মের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা ভিসাসংশ্লিষ্ট সুবিধা ও প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে দেশ বেছে নেন। এমএইচ গ্লোবাল গ্রুপের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন এ কে এম গোলাম কিব্রিয়া জানান, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে স্টুডেন্ট ভিসা প্রাপ্তির হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ইউরোপের অনেক দেশেও আবেদন বাড়ছে। যুক্তরাজ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ; কনফার্মেশন অ্যাকসেপ্ট্যান্স ফর স্টাডিজ (CAS) ভিত্তিক আবেদন করলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের (যেমন—জার্মানি, আয়ারল্যান্ড) দেশগুলো জনপ্রিয়।মূলকারণগুলো হলো: এক বছরের মাস্টার্স কোর্স এবং দ্রুত ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিগ্রিওক্যারিয়ার সম্ভাবনা দীর্ঘ পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক সুবিধাতুলনামূলক কম টিউশন ফি বা স্কলারশিপখণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ
অস্ট্রেলিয়ার পার্থে মারডক ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা করা আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, বিদেশে শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবমুখী ও ব্যবহারিক। পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকায় খরচ মোকাবেলা সহজ। বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই করার ক্ষেত্রে তিনি র্যাংকিং, কোর্সের বিষয়, চাকরির সম্ভাবনা, টিউশন ফি, অবস্থান এবং ভিসানীতি বিবেচনা করেছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি পার্শিয়াল স্কলারশিপ পেয়েছি। আবেদন বিশ্বস্ত এজেন্সির মাধ্যমে করেছি, যা পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় স্পাউসের পূর্ণকালীন কাজের সুযোগ থাকাও বড় সুবিধা ছিল।’ তবে শিক্ষার্থীরা কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, যেমন ভিসা প্রক্রিয়া ও নীতির পরিবর্তন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও আর্থিক নথির জটিলতা, ইংরেজি দক্ষতার অতিরিক্ত শর্ত, এবং নির্দিষ্ট দেশে ডিপেন্ডেন্ট ভিসার সীমাবদ্ধতা। এছাড়া ভুল তথ্য বা প্রতারণার ঝুঁকিও থাকে।
অস্ট্রেলিয়ার দি ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসল থেকে স্নাতকোত্তর করা বেলাল হোসাইন বলেন, ‘বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগে শিক্ষার্থীর উচিত সঠিক গাইডলাইন অনুসরণ করা। যোগ্যতা, সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিবেচনা করে দেশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচন করা দরকার। অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিলে ঝামেলা কমে।’
অনেকে বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করছেন। উদাহরণস্বরূপ, তন্ময় হালদার ইরাসমাস মুন্ডাস বৃত্তি নিয়ে স্পেনের ইউনিভার্সিতাত আউতোনোমা দে বার্সেলোনায় (UAB) স্নাতক পড়াশোনা করছেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হওয়ায় বিদেশে পড়াশোনা ব্যয়বহুল। তাই বৃত্তির সুযোগ পেলেই বিদেশে যাওয়া পরিকল্পনা করি। আবেদন, সুপারিশপত্র, প্রবন্ধ—all নিজে নিজে করেছি। পরিকল্পিতভাবে এগোলেই ফুল ফান্ড বৃত্তি সম্ভব।’ রাশিয়ার এনআই লোবাচেভস্কি ন্যাশনাল রিসার্চ নিঝনি নভগোরোদ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসে পড়াশোনা করা রবিন সূত্রধর বলেন, ‘বিদেশে নিজেকে গড়ার অনেক সুযোগ আছে। আন্তরিক পরিশ্রম, ধৈর্য ও ইতিবাচক মনোভাব থাকলে যেকোনো উন্নত দেশে উচ্চশিক্ষা সম্ভব। রাশিয়ার সহজ ভর্তি প্রক্রিয়া, আধুনিক শিক্ষাকাঠামো এবং সরকারি বৃত্তি আমাকে এই দেশ বেছে নিতে প্রভাবিত করেছে।’