ইসরা ও মেরাজ শুধু একটি অলৌকিক সফরের নাম নয়; এটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসসমূহের এক অনন্য দলিল। এই মহিমান্বিত ঘটনা নবুয়তের সত্যতা, সালাতের ফরজিয়ত এবং রিসালাতের সর্বজনীনতার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। পবিত্র কোরআনের ঘোষণার পাশাপাশি সহিহ হাদিসসমূহে এই মহাসফরের বিস্তৃত বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে, যা যুগের পর যুগ ঈমানদারদের হৃদয়ে বিশ্বাস ও দৃঢ়তা সৃষ্টি করে আসছে। ইসরা ও মেরাজের ঘটনাবলির মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ, বিস্তারিত ও হৃদয়স্পর্শী বর্ণনাটি সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)–এর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সফরের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। হাদিসটি সংরক্ষিত রয়েছে সহিহ বুখারি গ্রন্থে। এক রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদুল হারামে অবস্থান করছিলেন। তখন তাঁর কাছে তিনজন ফেরেশতা আগমন করেন। যদিও তাঁর চক্ষু নিদ্রায় ছিল, তবে তাঁর অন্তর সম্পূর্ণ সজাগ ছিল। কারণ নবীদের ক্ষেত্রে চক্ষু ঘুমালেও অন্তর কখনো নিদ্রিত হয় না। ফেরেশতারা পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করলেন যে, এঁদের মধ্যে কে সর্বোত্তম ব্যক্তি। সিদ্ধান্ত হলো—সর্বোত্তম ব্যক্তিকেই আল্লাহর বিশেষ সফরের জন্য নির্বাচন করা হবে। পরবর্তী আরেক রাতে ফেরেশতারা আবার আগমন করেন। তাঁরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনো কথা না বলে উঠিয়ে যমযম কূপের কাছে নিয়ে যান। সেখানে হজরত জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্ষ বিদীর্ণ করেন, বক্ষ ও উদর থেকে সবকিছু বের করে যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করেন এবং তা সম্পূর্ণভাবে পরিশুদ্ধ করেন। এরপর একটি সোনার পাত্র আনা হয়, যা ঈমান ও হিকমতে পরিপূর্ণ ছিল। সেই ঈমান ও হিকমত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্ষ ও শিরায় পূর্ণ করে দেওয়া হয়। তারপর বক্ষ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এটি ছিল আসমানি সফরের পূর্বে এক বিশেষ ঐশী প্রস্তুতি।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে জিবরাইল (আ.) আসমানের দিকে আরোহণ করেন। প্রথম আসমানের দরজায় কড়া নাড়া হলে ফেরেশতারা জিজ্ঞাসা করেন, কে এসেছেন। জিবরাইল (আ.) নিজের পরিচয় দেন এবং জানান যে তাঁর সঙ্গে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রয়েছেন। ফেরেশতারা নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে স্বাগত জানান এবং আনন্দ প্রকাশ করেন। প্রথম আসমানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আদম (আলাইহিস সালাম)–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আদম (আ.) তাঁকে স্বাগত জানান এবং উত্তম পুত্র বলে সম্বোধন করেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি প্রবাহমান নদী দেখতে পান, যেগুলো নীল ও ফুরাত নদীর মূল উৎস। এরপর তিনি দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম আসমানে আরোহণ করেন। প্রতিটি আসমানেই ফেরেশতারা তাঁকে একইভাবে স্বাগত জানান। প্রতিটি আসমানে বিভিন্ন নবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। এই সাক্ষাৎসমূহ প্রমাণ করে যে সব নবী একই সত্যের বাহক এবং রিসালাতের ধারাবাহিকতা একক ও ঐক্যবদ্ধ।
পরিশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদরাতুল মুনতাহায় উপনীত হন। এটি এমন এক সীমা, যার ঊর্ধ্বে কোনো সৃষ্টি পৌঁছাতে পারে না। সেখানে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিকটবর্তী হন এবং ওহীর মাধ্যমে উম্মতের জন্য প্রথমে দিন ও রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেন। ফেরার পথে হজরত মূসা (আলাইহিস সালাম) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উম্মতের দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর পরামর্শে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে যান। প্রতিবারই আল্লাহ তায়ালা তাঁর দয়ায় সালাতের সংখ্যা কমিয়ে দেন। এভাবে শেষ পর্যন্ত সালাত পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারিত হয়। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, তাঁর সিদ্ধান্ত অপরিবর্তনীয়। উম্মুল কিতাবে সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত হিসেবেই লিপিবদ্ধ রয়েছে, তবে উম্মতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্তে সহজ করে দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি সালাতের সওয়াব দশ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং জাগ্রত হয়ে দেখেন—তিনি আবার মসজিদুল হারামেই অবস্থান করছেন। এভাবেই এক রাতের মধ্যে সম্পন্ন হয় মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক মহিমান্বিত সফর। ইসরা ও মেরাজ আমাদের শিক্ষা দেয় যে সালাত মুমিনের জন্য আল্লাহর বিশেষ উপহার, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত, এবং আল্লাহ তায়ালার দয়া বান্দার সব দুর্বলতাকে অতিক্রম করে।