মানুষ কেবল বিশ্বাসী সত্তা নয়; সে অনুভূতির মানুষও। প্রিয়জনের বিদায়ে চোখের জল ঝরা, হৃদয় ভারাক্রান্ত হওয়া—এগুলো মানবস্বভাবেরই অংশ। ইসলাম এই স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিকে অস্বীকার করেনি, বরং তাকে সংযম, সবর ও আল্লাহর সন্তুষ্টির সীমার ভেতরে রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। শোক থাকবে, কিন্তু তা যেন ঈমানকে ভেঙে না দেয়; ব্যথা থাকবে, কিন্তু তা যেন অভিযোগে পরিণত না হয়।এটাইইসলামেরভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। এই ভারসাম্যের জীবন্ত দৃষ্টান্ত আমরা পাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনে। বিশেষ করে তার প্রিয় পুত্র ইব্রাহিম (রা.)-এর ইন্তেকালের মুহূর্তে নবীজির আচরণ শোক মোকাবিলায় এক অনুপম আদর্শ হয়ে আছে। সেখানে আছে অশ্রু, আছে হৃদয়ের ব্যথা; আবার একই সঙ্গে আছে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্টি ও আত্মসমর্পণ।এই প্রেক্ষাপটেই সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত নিম্নোক্ত হৃদয়স্পর্শী হাদিসটি আমাদের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে—
‘আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে আবু সায়ফ কর্মকারের নিকট গেলাম। তিনি ছিলেন (নবী-তনয়) ইব্রাহিম (রা.)-এর দুধ সম্পর্কীয় পিতা। আল্লাহর রাসুল (সা.) ইব্রাহিম (রা.)-কে তুলে নিয়ে চুমু খেলেন এবং নাকে-মুখে লাগালেন। অতঃপর (আরেকবার) আমরা তার (আবু সায়ফের) বাড়িতে গেলাম। তখন ইব্রাহিম (রা.) মুমূর্ষু অবস্থায়। এতে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর উভয় চক্ষু থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। তখন আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আর আপনিও? (ক্রন্দন করছেন?) তখন তিনি বললেন, অশ্রু প্রবাহিত হয় আর হৃদয় হয় ব্যথিত। তবে আমরা মুখে তা-ই বলি, যা আমাদের রব পছন্দ করেন। আর হে ইব্রাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমরা অবশ্যই শোকসন্তপ্ত।’(বুখারি, হাদিস : ১৩০৩) এই হাদিস আমাদের স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে ইসলাম শোককে নিষিদ্ধ করেনি, বরং শোককে শালীনতা ও ঈমানের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে বাঁচার নির্দেশ দিয়েছে।
চোখের অশ্রু, হৃদয়ের ব্যথা—এগুলো দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং মানবিকতার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। তবে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এমন সব আচরণ, যা আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে। যেমন—বুক চাপড়ানো, উচ্চস্বরে বিলাপ করা, ভাগ্যকে দোষারোপ করা কিংবা মুখে এমন কথা বলা, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে।রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন:‘শোক থাকবে, কিন্তু তা হবে সংযত; কষ্ট থাকবে, কিন্তু অভিযোগ থাকবে না; অশ্রু ঝরবে, কিন্তু জিহ্বা আল্লাহর রিজার সীমা অতিক্রম করবে না।’
এই হাদিসে আমাদের প্রিয়জন হারানোর কঠিন সময়ে আমাদের দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং নিজেদের শোককে ঈমানের সৌন্দর্যে রূপ দেওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করা।
আসুন, আমরা শোককে অস্বীকার না করে তাকে সবর, তাওহিদ ও আখিরাতমুখী বিশ্বাসে পরিণত করি। আল্লাহ যেন আমাদের বিপদের মুহূর্তে এমন ভাষাই উচ্চারণ করার তাওফিক দেন, যা তিনি পছন্দ করেন এবং এমন শোকই ধারণ করার শক্তি দেন, যা আমাদের ঈমানকে আরো দৃঢ় করে।
