শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত এক সামরিক অভিযানের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বরাতে জানা গেছে, মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তাকে ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে হাজির করা হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) দীর্ঘদিন ধরে মাদুরো এবং ভেনেজুয়েলার শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার সংশ্লিষ্ট অভিযোগের তদন্ত চালিয়ে আসছিল। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে নিজ দেশ থেকে কোনো রাষ্ট্রনায়ককে গ্রেপ্তার করে অন্য দেশে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনা এই প্রথম নয়। অতীতেও এমন নজির রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এর উদাহরণ হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ। তারও আগে একই পরিণতি হয়েছিল পানামার সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগার। ম্যানুয়েলনোরিয়েগা — পানামা (১৯৮৯–১৯৯০) আশির দশকে পানামার ক্ষমতায় ছিলেন সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারওমানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে।১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে পানামায় এক মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক চরম অবনতির দিকে যায়। এর পর পানামা খালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা এবং নোরিয়েগাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ নামে সামরিক অভিযান চালায়। আনুষ্ঠানিক তথ্যমতে, ওই অভিযানে পানামার সেনা ও বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে কয়েক শত মানুষ নিহত হন, পাশাপাশি ২৩ জন মার্কিন সেনাও প্রাণ হারান। চরম সংঘর্ষের মুখে নোরিয়েগা ভ্যাটিকানের দূতাবাসে আশ্রয় নিলেও ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। পরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কলম্বিয়ার মাদক সম্রাট পাবলো এসকোবার–এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতারঅভিযোগে বিচার করা হয়। মাদক ও অর্থ পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ২০ বছর কারাভোগ করেন। পরবর্তীতে ফ্রান্সে প্রত্যর্পণের পর ২০১১ সালে পানামায় ফেরেন। এক বছর পর তার মৃত্যু হয়।হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ — হন্ডুরাস (২০২১) ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ। ক্ষমতায় থাকাকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নির্বাচনী অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন, তিনি নির্বাচনী প্রচারণার সময় কুখ্যাত মাদক সম্রাট জোয়াকিন এল চ্যাপো গুজমান–এর কাছ থেকে এক মিলিয়ন ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন। এর বিনিময়ে হন্ডুরাস হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইন পাচারের পথ সুগম করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালে মাদকসহ গ্রেপ্তার হন তার ভাই অ্যান্টোনিও ‘টনি’ হার্নান্দেজ। পরের বছর দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ক্ষমতা ছাড়ার পর ২০২২ সালে হন্ডুরাস কর্তৃপক্ষ হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। সেখানে বিচার শেষে তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে গত বছরের ১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সাজা মওকুফ করেন। এবার ডিইএর দায়ের করা মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগে নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। নোরিয়েগা কিংবা হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের মতো পরিণতি তার ক্ষেত্রেও ঘটবে কি না—তা নির্ধারণ করবে সময়ই।
