লাতিন আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা-তে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করার ঘটনা হঠাৎ ঘটেছে বলে মনে হলেও বাস্তবে এর প্রস্তুতি চলছিল দীর্ঘদিন ধরেই। কয়েক মাস আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার আশপাশের সমুদ্র এলাকায় যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক শক্তি জড়ো করছিল, যা আসন্ন অভিযানের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।এই প্রেক্ষাপটেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভের পর আরও বেশি করে পশ্চিমা শক্তির নজরে আসেন। বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে ও গোপনে তিনি মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়।মাদুরো আটক হওয়ার পরমাচাদোসামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে এবং এখন মাদুরোকে জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর ভাষায়, “এটাই স্বাধীনতার সূচনা।”রাজনৈতিকবিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে মাচাদোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত চললেও তিনি এসব বিষয়ে নীরব থেকেছেন—যা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। পরে নিউইয়র্কের একটি আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক ও সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্রেরঅভিযোগ আনা হয়।সিএনএনের বরাতে জানা যায়, গত বছরের শেষ দিকে মাচাদো সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর অনুরোধ করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, মাদুরো নিজ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কেও তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের যোগ্য বলে মন্তব্য করেন।এরপর থেকেই ক্যারিবীয় অঞ্চলে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন নৌযান লক্ষ্য করে সামরিকতৎপরতা বাড়তে থাকেআন্তর্জাতিকমানবাধিকারসংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় বহু মানুষ নিহত হন। সবশেষে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমেই মাদুরোকেআটক করা হয়।এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মাদুরোরপরভেনেজুয়েলার নেতৃত্বে কে আসছেন? অনেকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে মাচাদোকেই সামনে আনা হতে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, এমনটা হলে ভেনেজুয়েলার তেলনীতি বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এর সুবিধাভোগী হতে পারে।তবে সাধারণজনগণএইপরিবর্তনকে কীভাবে নেবে, তা এখনও অনিশ্চিত। বিক্ষোভ বা প্রতিরোধ হলে কঠোর দমন-পীড়নেরআশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে খুব একটাতোয়াক্কা করছে না বলেই মনেকরছেনপর্যবেক্ষকরা।ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৮৯ সালের পানামা অভিযানের পর এই প্রথম লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের ঘটনা ঘটল। ২০১৩ সালে হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ ও অভ্যন্তরীণ সংকটে দেশটির অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল, ফলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষও ছিল। সেই বাস্তবতায় মাদুরোর পতন বড় ধরনের গণ-আন্দোলনে রূপ নাও নিতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
